নিজস্ব প্রতিবেদক
চলতি ধারার দুর্নীতি-লুণ্ঠনের রাজনীতির বিপরীতে শোষণমুক্ত সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ার লক্ষ্যে বামপন্থীদের নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বামপন্থী দলগুলো। বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদ আয়োজিত জাতীয় কনভেনশন থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
কনভেনশনে বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল ও সংগঠকে নতুন এই জোটে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কনভেনশনে ঘোষণাপত্র পাঠের পাশাপাশি ৭দফা রাজনৈতিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। যার ভিত্তিতে আন্দোলন ও আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
তিনি বলেন, জুলাই সনদে বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিস্থাপন করতে চায়। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও এর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানের ১৫ মাসের মাথায় এসে বিজয় হাতছাড়া হতে চলেছে। এখনো লুটপাট ও দুর্নীতির ধারায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এ কারণে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক উত্থান জরুরি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও এর আকাঙ্খা বাস্তবায়ন হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের ১৫ মাসের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে যে, এবারের বিজয়ও হাতছাড়া হতে চলেছে। দেশ এখনো গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকট, নৈরাজ্য, দুর্নীতি, লুঠন, অবক্ষয়ের মধ্যে রয়েছে। সর্বগ্রাসী সংকট থেকে জনগণের মুক্তির জন্য বাম প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে ‘রেইনবো কোয়ালিশন’ গড়ে তুলতে হবে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, আজ থেকে বাম দলগুলোর কর্মীদের একটাই পরিচয় হবে। তা হলো আমরা সবাই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের মানুষ। তিনি বলেন, মব বায়োলেন্সের মত এসব অপকর্মের পেছনে ইউনূস সাহেব (প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস) স্বয়ং জড়িত। এসব কিছুতে তার হাত নেই, তা একদিন প্রমাণ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের যা খুশি তাই করতে করতে দেবে না জনগণ।
কনভেনশনের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফী রতন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, জনগণ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, দেশ ও দেশবাসীর জন্য সুখ-শান্তি-স্বস্তি ও প্রতিশ্রুতিময় নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে প্রগতিমুখীন গণতান্ত্রিক ধারার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই দেশের সকল দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল-বাম রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ, আদিবাসী তথা বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী সংগঠনসমূহ, শ্রম-কর্ম-পেশার সংগঠনসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহসহ, অধিকার আন্দোলনের কর্মী ও অপরাপর সব শক্তির সম্মিলনে ‘জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি’ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এই কনভেনশন থেকে আমরা সবার অংশগ্রহণে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের প্রস্তাব করছি এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মূল অঙ্গীকার হিসাবে খসড়া ঘোষণা ও কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করছি।
কনভেনশনে ৭দফা রাজনৈতিক প্রস্তাব তুলে ধরে বাসদ (মার্কসবাদী)’র সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মতলববাজ ধর্মাশ্রয়ী উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী স্বাধীন মত প্রকাশ ও ধর্মবিশ্বাসের ওপর হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য, মাজার-আখড়া-দরবার ভাঙা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে লালন-বাউল শিল্পীদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। সরকারকে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। মুক্তচিন্তার পক্ষের সকল গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-নাগরিক দল ও সংগঠনসমূহকে এ অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।
কনভেনশনে জানানো হয়, সারাদেশে জনগণের সাথে নিবিড় আলোচনা ও তাদের মতামত-পরামর্শের আলোকে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। জেলায় জেলায় কনভেনশন বা মতবিনিময় সভার মাধ্যমে এই যুক্তফ্রন্টের কার্যক্রম অংশগ্রহণকারী দল-সংগঠনের প্রতিনিধি ও দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা প্রগতিশীল ব্যক্তবর্গের সমন্বয়ে গঠিত ‘পরিচালনা কমিটি’ কর্তৃক পরিচালিত হবে। ‘যৌথ নেতৃত্বের’ ধারায় পরিচালনা কমিটি তার কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করবে। ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের মাধ্যমে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার যে সূচনা কনভেনশনের মাধ্যমে করা হলো, তার কর্মকাণ্ডে শামিল হওয়ার জন্য দেশের অপরাপর সব গণতন্ত্রমনা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা সমিতি ও ব্যক্তির প্রতি আহ্বান জানানো হয় কনভেনশনে।
কনভেনশনে আরো বক্তৃতা করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম এ সবুর, প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী, শ্রম-কর্ম-পেশার সংগঠনসমূহ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নেতারা।









Discussion about this post