নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ জোরদার করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে, সরকারের অনুরোধে ইরান আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশের জন্য তেলবাহী জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়া হবে না।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন নৌ করিডরটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এতে সম্মতি দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগেই তা ইরানকে জানাতে অনুরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধরত দেশটি। তাই দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা।
এদিকে ২৭,০০০ টন ডিজেল নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই আরো ১,২০,২০৫ টন তেল নিয়ে আরো চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আর এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের মাধ্যমে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার চুক্তির বাইরে সরাসরি ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে।
স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তবে বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টন সরবরাহ করছে। এভাবে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আসন্ন পাঁচটি চালানে আসা মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন জ্বালানি দিয়ে প্রায় ১৬ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
সোমবার সকালে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ সাদেক চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জ্বালানিবাহী জাহাজ পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং জানান, সোমবার রাতেও আরো একটি জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ভারত ও চীনের সহায়তার ইঙ্গিত
চীন ও ভারত বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশদুটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শুধু ভারত ও চীন নয়। প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্ন দেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
ফলে জ্বালানি সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু এবং জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠক শেষে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, জ্বালানি সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশকে জ্বালানি সহায়তা দিতেও আগ্রহী চীন।
ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির সুযোগ
বিপিসি এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনের সরবরাহ ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। তবে চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন আমদানির সুযোগ এখনও রয়েছে।
বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য অতিরিক্ত এই সরবরাহ মূলত মার্চের শেষ সপ্তাহ ও এপ্রিল মাসের পুরো চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ মার্চের শুরুতে নির্ধারিত দুটি ডিজেল চালান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছায়নি।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বেশকিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশের কাছে তেল বিক্রির জন্য আমাদের কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠাবে।
এ সপ্তাহে আসছে আরো চারটি ট্যাংকার
বন্দর সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে ‘শিউ চি’ নামের একটি ট্যাংকার গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে। শিপিং এজেন্টরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরো চারটি ডিজেলবাহী ট্যাংকার বন্দরে পৌঁছাবে।
‘লিয়ান হুয়ান হু’ নামের আরেকটি ট্যাংকার প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে সোমবার রাতে বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। ‘এসপিটি থেমিস’ নামের আরেকটি ট্যাংকার বৃহস্পতিবার প্রায় ৩০ হাজার ৪৮৪ টন ডিজেল নিয়ে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এছাড়া ‘র্যাফেলস সামুরাই’ এবং ‘চাং হাং হং তু’ নামের আরো দুটি জাহাজ শনিবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টন করে ডিজেল থাকবে।
চারটি ট্যাংকারের স্থানীয় এজেন্ট প্রাইড শিপিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম টিবিএসকে জানান, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছাবে।
জরুরি আমদানির উদ্যোগ
সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে বিকল্প উৎস থেকে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) ব্যবহার করা হবে। জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল আমদানির জন্য উত্তর আমেরিকার কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রোববার টিবিএস-কে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এপ্রিল মাসে পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সব সম্ভাব্য বিকল্প খতিয়ে দেখছে।
তিনি বলেন, ‘এপর্যন্ত মার্চ মাসে আমাদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায়, সরবরাহ শৃঙ্খলে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) এর মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল সংগ্রহ নিশ্চিত করতে আমরা সব সম্ভাব্য উৎস খতিয়ে দেখছি।’
বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ কবে নিশ্চিত হবে—এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’










Discussion about this post