নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে অসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে এবং জনগণের মনে আস্থা ফেরাতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন।
তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়াই এ সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য।
সেনা সদর থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে ও পরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতা প্রতিরোধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর। এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করবে।
সেনা সদরের সংবাদ সম্মেলনের আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সমন্বয় সভায় অংশগ্রহণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিড মিনিস্ট্রি হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। সে অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচন-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেছে। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচনপূর্ব সময়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১০ জানুয়ারি থেকে মাঠপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০ জানুয়ারি তা এক লাখে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায়, ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোয় মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান ও চেকপোস্টের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারের হারও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, ২০ জানুয়ারি থেকে গত ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার অধিকাংশই দেশি-বিদেশি পিস্তল। এ ছাড়া গোলাবারুদ, ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। ৩১ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় যৌথ অভিযানে চারটি বিদেশি পিস্তল ও ১০টি গ্রেনেডসদৃশ হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরঞ্জাম পরিবহনে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে আগে থেকেই হেলিকপ্টার মোতায়েন থাকবে। সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, অসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য প্রচার এবারের নির্বাচনে বড় হুমকি উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, এই অপতথ্যের মাধ্যমে প্রার্থী বা দলকে হেয় করা, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা কিংবা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা অথবা যেকোনো একটি ছোট বিষয়কে অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করার চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের অপপ্রচার প্রতিরোধে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।
বড় দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, মাসল পাওয়ার, ভুয়া ব্যালট ছাপানো—এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কোনো আহ্বান আছে কি না এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে যে সংশয় আছে, সেখানে সরকারের ব্যর্থতা দেখছেন কি না? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক বলেন, সংশয় দূর করতেই সেনাবাহিনী প্রধান অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল, প্রশাসন ও বাহিনীকে আশ্বস্ত করা এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করা। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচনী সংস্কৃতির অংশ। যতক্ষণ সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি না হয়, ততক্ষণ এটি প্রশাসনিক বিষয়। তবে অসামরিক প্রশাসন প্রয়োজন মনে করলে সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক সহায়তা দেবে। মনে রাখতে হবে, মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের দায়িত্ব রিটার্নিং অফিসার ও পুলিশ প্রশাসনের।
নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব কোনো হুমকি বিশ্লেষণ আছে কি না— এ প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, হুমকি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই মোতায়েন পরিকল্পনা করা হয়েছে।










Discussion about this post