নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি সেবামূলক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফেরাতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্রের (বর্তমানে বিটিভি রাজশাহী উপকেন্দ্রে সংযুক্ত) কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ মোল্লা আবু তৌহিদ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্রের প্রযোজক (সঙ্গীত) মো: ফারুককে সরকারি চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
মোল্লা আবু তৌহিদের বিস্তর অভিযোগের ভয়াবহতার মধ্যে অন্যতম হলো- বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় বিটিভির অভ্যন্তরে সিন্ডিকেট গড়ে আয় বহির্ভূত অঢেল সম্পত্তি ও অর্থের মালিক বনে যাওয়া। দুদক কর্তৃক অনুসন্ধান চলমান এবং ইতোমধ্যে আয় বহির্ভূত সম্পত্তির প্রমাণ মেলেছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া শিল্পী নির্বাচন ও স্বজনপ্রীতি বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। বিটিভির প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোল্লা আবু তৌহিদের বিরুদ্ধে ১৭১১ জন শিল্পীর অডিশন নিয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি অর্থের বিনিময়ে অকৃতকার্যদের পাশ করানো এবং তৎকালীন মহাপরিচালকের ছেলেকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ৫টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিধি বহির্ভূতভাবে নির্বাচিত করার মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত ছিলেন।
জানা যায়, ১৭১১ জন শিল্পী তালিকাভুক্তির চূড়ান্ত অডিশনের ভিডিও ধারণ করে বিটিভিতে সম্প্রচার, তদন্ত কমিটি কর্তৃক যাচিত তথ্য সরবরাহ না করা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনসংগত আদেশ অমান্য, অবৈধ অর্থের বিনিময়ে অডিশনে অকৃতকার্য শিল্পীদের অন্য বোর্ড বসিয়ে পাশ করানো, অডিশনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে অনিয়ম ও কারচুপি, এবং বিটিভির তৎকালীন মহাপরিচালকের ছেলে মো: সায়ন্ত মিশকাত জামিকে অডিশনে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ৫ ক্যাটাগরিতে বিধি বহির্ভূতভাবে নির্বাচিত করা ইত্যাদি বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত ০৭.১১.২০২৪ তারিখ পত্রের মাধ্যমে উল্লেখিত অভিযোগসমূহ তদন্তের জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় গত ০৩.০৩.২০২৫ তারিখে ০৩ (তিন) সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদনে মোল্লা আবু তৌহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ০৬/২০২৫ নম্বর বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়।
উল্লেখ্য, তাঁর এহেন কর্মকাণ্ড সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিধায় একই বিধিমালার বিধি ১২(১) অনুযায়ী তাঁকে সরকারি চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় যা ইতোমধ্যে কার্যকর বলে গণ্য হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং: ১৫.০০.০০০০.০০০.০২৩.২৭.০৩৩৯.২৫- ৪৫৬ তারিখ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
শিক্ষাগত জাল সার্টিফিকেট দিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্রের প্রযোজক (সঙ্গীত) মো: ফারুক ১৯৮৫ সালে চুক্তিভিত্তিক বাদ্যযন্ত্র শিল্পী হিসেবে বিটিভিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে বিটিভির সরাসরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ০২.০৪.১৯৮৯ তারিখে বিটিভির রাজস্বখাতে ‘ইনস্ট্রুমেন্টালিস্ট’ পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে চাকরিতে যোগদান করেন। এ বিষয়ে বিটিভির একাধিক শিল্পী কুশলী ও কর্মকর্তা জানান, মোহাম্মদ ফারুক এর এই নিয়োগের পেছনে তার চাচা বিশিষ্ট সুরকার শাহনেওয়াজ এর হস্তক্ষেপ ছিল।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী ‘ইনস্ট্রুমেন্টালিস্ট’ হিসেবে ৬(ছয়) বছরের অভিজ্ঞতাসহ এসএসসি পাশ-এর যোগ্যতা আবশ্যক। কিন্তু মোঃ ফারুক চাকরিতে যোগদানকালে এসএসসির যে সনদপত্রটি জমা দিয়েছিলেন সেটি ভুয়া/জাল। এছাড়া তিনি দুটি জাতীয় পরিচয় পত্র ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অনিয়ম ও প্রতারণার দায়ে মোহাম্মদ ফারুকের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়।
মোঃ ফারুকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তের জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি কর্তৃক দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে মো: ফারুক-এর এসএসসির সনদপত্রটি ভুয়া ও জাল বলে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করার সুপারিশ করা হয়। সুপারিশের প্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ০৭/২০২৫ রুজুসহ অধিকতর তদন্তের জন্য ০১ (এক) সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
উল্লেখ্য, তদন্তকালে এসএসসি সনদপত্রটি যাচাইয়ের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড, ঢাকায় প্রেরণ করা হলে ঢাকা বোর্ডের গত ২৭.০৮.২০২৫ তারিখের ১৪০৭৫ সংখ্যক পত্রের মাধ্যমে জানানো হয় যে সনদপত্রটি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে ইস্যুকৃত নয়। সনদপত্রটির ফটোকপিতে বোর্ড কর্তৃপক্ষ লিখেন যে, ‘Verified and Found Fake’। অর্থাৎ সনদপত্রটি ভুয়া (Fake) হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর এহেন কর্মকাণ্ড সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিধায় একই বিধিমালার বিধি ১২(১) অনুযায়ী তাঁকে সরকারি চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় যা ইতোমধ্যে কার্যকর বলে গণ্য হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং: ১৫.০০.০০০০.০০০.০২৩.২৭.০৩৪০.২৫- ৪৫৭ তারিখ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
বিটিভির মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়মের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি কড়া বার্তা। পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, দুর্নীতি ও জালিয়াতি করে কেউ পার পাবে না—এটাই এই প্রজ্ঞাপনের মূল প্রতিধ্বনি। শিল্পী-কুশলী এবং বিটিভির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, শুধু বরখাস্ত নয়, বিটিভির ভাবমূর্তি রক্ষায় এই তদন্ত প্রক্রিয়া যেন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যায়।










Discussion about this post