ডেস্ক নিউজ:
ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দলের প্রধান (আমির) পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, এটা ঈশ্বরপ্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্যের কারণে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, দল এখনো প্রস্তুতি নিচ্ছে—ভবিষ্যতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারটিতে জামায়াতের উত্থান, ইসলামী আইন প্রয়োগ, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, ১৯৭১-এর ভূমিকা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলজাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।
আল জাজিরা: নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে কথা বলছি এবং সব হিসাব অনুযায়ী আপনার দল হয়তো তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো করবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত? কারণ জামায়াতে ইসলামী বলেছে, আপনার নেতারা বলেছেন যে আপনারা চান এই দেশ ইসলামি আইন দ্বারা পরিচালিত হোক।
শফিকুর রহমান: আপনি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা বর্তমান দেশের আইনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। জনগণের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করব। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করব না।
আল জাজিরা: আপনি জনগণের ইচ্ছার কথা বলছেন, কিন্তু গত বছরের জুলাই মাসে এক জনসভায় আপনার দলের সহসভাপতি মুজিবুর রহমান, যেখানে আপনিও উপস্থিত ছিলেন, বলেছিলেন ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদে শুধু ইসলামি আইন মানা উচিত এবং মানুষের বানানো কোনো ধারণা বা ব্যবস্থা সেখানে থাকা উচিত নয়।
শফিকুর রহমান: এ ক্ষেত্রে দলের প্রধানের বক্তব্য অনুসরণ করা উচিত।
আল জাজিরা: আপনি বলছেন দলের প্রধানের বক্তব্যই অনুসরণ করবেন। তাহলে কি আপনি তার কথাকে প্রত্যাখ্যান করছেন?
শফিকুর রহমান: না, না। আমি কিছুই প্রত্যাখ্যান করছি না বা গ্রহণ করছি না। তবে যখন দলের কৌশল বিবেচনা করা হবে, তখন দলের প্রধান যা বলবেন সেটাই দেখা হবে। ইসলাম যে মূল্যবোধগুলো স্বীকৃতি দেয়, আমরা তা প্রচার করছি; যেমন—দুর্নীতি বিরোধিতা, সর্বত্র স্বচ্ছতা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার রক্ষা।
আল জাজিরা: যদি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে কি ইসলামী আইন চালু করবেন?
শফিকুর রহমান: যদি দেশের উন্নতির জন্য তা অপরিহার্য হয়, তাহলে সংসদ বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেবে। আমি নই। সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে।
আল জাজিরা: আপনি প্রস্তাব করেছিলেন নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর, কারণ কোরআনের নীতির আলোকে তারা তাদের সন্তানদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। একবিংশ শতাব্দীতে আপনি কেন এমন প্রস্তাব দিলেন? শফিকুর রহমান: কে বলেছে? না আমি এমন কথা বলিনি।
আল জাজিরা: এটা আপনার দেওয়া প্রস্তাব, যা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। শফিকুর রহমান : না, না। আমি যা বলেছি তা হলো— একজন মা একই সময়ে সন্তান বহন করছেন, সন্তানকে দেখাশোনা করছেন, আর একই সময়ে পুরুষদের মতো সমান দায়িত্ব ও সমান সময় কাজ করছেন— এটা ন্যায়সংগত নয়। অন্তত স্তন্যদানকালীন সময়ে, যখন তিনি সন্তান জন্ম দিচ্ছেন বা সন্তান লালন করছেন, তখন তাকে সম্মান দেখাতে হবে।
আল জাজিরা: কিন্তু ইতোমধ্যেই মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ আছে, যা অনেক নারী গ্রহণ করেন। শফিকুর রহমান : শুধু ছয় মাসের জন্য। হ্যাঁ। আমরা মনে করি এটা যথেষ্ট নয়। একটি শিশু ছয় মাসে বড় হয়ে ওঠে না।
আল জাজিরা: ঠিক আছে, কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন আপনার প্রস্তাব ভিন্নভাবে গৃহীত হয়েছে। এ নিয়ে আসলে প্রতিবাদ হয়েছে। বাংলাদেশের নারীসহ মানুষজন রাস্তায় নেমেছে। তারা বলছে, তারা কাজ করবে নাকি ঘরে থাকবে— এটা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
শফিকুর রহমান: এটা খুবই নগণ্য, ভাই।
আল জাজিরা: তারা বলছে আপনার প্রস্তাব নারীদের আবার অন্ধকারে ঠেলে দেবে এবং তাদের স্বাধীনতা সীমিত করবে। শফিকুর রহমান : না, অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এটা তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়। কিছু অ্যাকটিভিস্ট আছেন যাদের আদর্শ আমাদের বিপরীত। তারা রাস্তায় নামতে পারেন। আমরা সম্মান করি।
আল জাজিরা: আপনি জানেন, স্যার, বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে লাখো নারী কাজ করেন, বিশেষ করে পোশাকশিল্পে। ৫০ শতাংশেরও বেশি নারী। তারা সেখানে পৌঁছাতে দশকের পর দশক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তারা সেই ধারণার বিরুদ্ধে লড়েছে যে নারীদের শুধু মা হতে হবে এবং সন্তান দেখাশোনা করতে হবে। পুরুষরাও সেই দায়িত্ব নিতে পারে। আর আশঙ্কা হলো আপনার প্রস্তাব সময়কে পিছিয়ে দিচ্ছে, ফলে নিয়োগকর্তারা নারীদের নিয়োগ দিতে চাইবে না কারণ তাদের কর্মঘণ্টায় সীমাবদ্ধতা থাকবে।
শফিকুর রহমান: এটা আপনার উদ্বেগ, কিন্তু বাস্তবতা নয়। আমি আমার বক্তব্যের পর কয়েকটি পোশাকশিল্প পরিদর্শন করেছি। আমি কোথাও এমন কিছু দেখিনি। বরং তারা স্বস্তি অনুভব করেছে। হ্যাঁ, তারা বলেছে দুই বা আড়াই বছর পর আবার কাজে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। কিন্তু যখন তারা চাকরি ছেড়ে দেয়, তখন আর ফিরে আসে না।
আল জাজিরা: আপনি বলেন যে আপনি নারীদের সম্মান করেন এবং বিশ্বাস করেন যে নারীরা নেতৃত্বের অবস্থানে উঠতে পারে। আমি কি জানতে পারি এই সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কতজন নারী প্রার্থী দিয়েছে?
শফিকুর রহমান: না, একজনও নয়। তবে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা ইতিমধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি যেখানে আমাদের বোনেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং সফল হয়েছে। ভবিষ্যতে আমরা সংসদেও তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।
আল জাজিরা: কিন্তু নিশ্চয়ই অন্য কোনো দলে শূন্য নয়। কেন অন্তত একজন নারী প্রার্থীও নেই…
শফিকুর রহমান: উত্তর হলো আমরা তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাই ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। এ বিষয়ে আমরা তাদের প্রতি অসম্মানজনক নই।
আলজাজিরা: জামায়াতের প্রধানের পদ নিয়ে কী বলবেন? কোনো নারী কি একদিন আপনার জায়গা নিতে পারে?
শফিকুর রহমান: এটা সম্ভব নয়। সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহ প্রত্যেককে তাদের নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। আপনি কখনও সন্তান জন্ম দিতে পারবেন না। আমরা কখনও সন্তানকে স্তন্যপান করাতে পারব না। এটা আল্লাহ প্রদত্ত। আর পুরুষ ও নারীর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।
আল জাজিরা: আমি বুঝতে পারছি না। প্রথমত, সব নারী মা হতে চান বা হবেন এমন নয়। কিন্তু হলেও, সন্তান লালন-পালন করলেও, কেন তারা জামায়াতের মতো একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে পারবেন না?
শফিকুর রহমান: কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তারা সীমিত থাকবেন। কীভাবে? অসুবিধা আছে। আপনি জানেনই। আমরা তা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যিনি সন্তান জন্ম দেবেন, তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? এটা সম্ভব নয়। কখনও নয়। আল্লাহই সবকিছু ভালো জানেন।
আল জাজিরা: এটা বেশ বিস্ময়কর যে আপনি এমন দেশে এটা বলছেন যেখানে গত তিন দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
শফিকুর রহমান: আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিনি। আমি আগেই বলেছি আমরা অসম্মানজনক নই। হ্যাঁ। কিন্তু যদি আপনি বিশ্বে তাকান, উন্নত দেশগুলোতে কতজন নারী সামনে এসেছে?
আল জাজিরা: অদ্ভুত। আপনি বলছেন তারা কোনো সংগঠনের প্রধান হতে পারে না অথচ তারা ১৬০–১৭০ মিলিয়ন মানুষের একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারে? তাহলে স্পষ্টতই নারীরা নেতৃত্বের অবস্থানে সক্ষম।
শফিকুর রহমান: বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই এটাকে সম্ভব মনে করেনি। এটাই বিশ্বের বাস্তবতা।
আল জাজিরা: অনেক দেশে নারী নেতা ছিলেন, আপনার দেশসহ।
শফিকুর রহমান: তবে অল্প কয়েকটি দেশে।
বিএনপি জোট সরকার ও নারী নেতৃত্ব প্রসঙ্গে
আল জাজিরা: আপনি আসলে বিএনপির সঙ্গে একটি সরকারে ছিলেন। আপনি একটি জোট সরকারের অংশ ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া একজন নারী, তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। হ্যাঁ। আপনি কি মনে করেন তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভালো কাজ করেছেন?
শফিকুর রহমান: এটা আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। এটা তাদের দলের সিদ্ধান্ত। আমাদের উচিত তাদের দলের মতামতকে সম্মান করা। আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না।
আল জাজিরা: শফিকুর রহমান, শুধু লিঙ্গ অধিকার নয়। আশঙ্কা হলো জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আপনার ছাত্রনেতারা গত মাসে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছে, যেগুলো পরে আক্রান্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত ছাত্র সংগঠনের নেতা মোস্তাকুর রহমান এক সমাবেশে বলেছিলেন— আমরা ঘোষণা করছি তথাকথিত সংবাদপত্রগুলো, যেমন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বন্ধ করে দিতে হবে। যদি এসব পত্রিকার কোনো সাংবাদিক এখানে উপস্থিত থাকেন, তবে তারা যেন অবিলম্বে চলে যান। আরেকজন জামায়াত ছাত্রনেতা, যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, তিনি বারবার বলেছেন— ছায়ানট ও উদীচী, এই দুটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে হবে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য।
শফিকুর রহমান: আপনি এসব বক্তব্য লক্ষ করেছেন, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য লক্ষ করেননি। আমরা ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। আমরা নিন্দা করেছি এবং কখনও সমর্থন করিনি।
আল জাজিরা: কিন্তু এসব নেতাদের বিরুদ্ধে আপনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
শফিকুর রহমান: শিবির ব্যবস্থা নেবে। এটা আমাদের সরাসরি সংগঠন নয়। এটা ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিষয়। দয়া করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন।
আল জাজিরা: স্যার, আমি জানতে চাই, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের কী হবে? আমি জানি আপনি বলেছেন সব ধর্মকে সমানভাবে দেখা হবে, কিন্তু জামায়াতের অতীত রেকর্ড তো অন্যরকম দেখায়, তাই না?
শফিকুর রহমান: কোন রেকর্ড?
আল জাজিরা: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যখন আপনি এবং বিএনপি ২০০১–২০০৬ সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন, তখন হিন্দুদের ওপর হামলা ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারীরা বিএনপি ও জামায়াতের সদস্য ছিল।
শফিকুর রহমান: আমরা চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি। জামায়াতে ইসলামী থেকে কেউ এমন ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না।
আল জাজিরা: আপনি কি জামায়াতের কোনো ভূমিকা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন?
শফিকুর রহমান: হ্যাঁ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এবং আমরা বহুবার খুব স্পষ্টভাবে এটা বলেছি। এখনো বলছি।
আল জাজিরা: জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের বিদ্রোহের পর সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় জামায়াত ও বিএনপির কিছু সমর্থক প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় জড়িত ছিল।
শফিকুর রহমান: আমি এটা প্রত্যাখ্যান করছি।
আল জাজিরা: আপনি কি কিছুটা অস্বীকার করছেন? আমি আপনাকে দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার দুটি ভিন্ন সময়ের মানবাধিকার প্রতিবেদন উল্লেখ করেছি, আর আপনি বলছেন সবই মিথ্যা। শফিকুর রহমান : হ্যাঁ, হ্যাঁ। সব মিথ্যা। না, আমি বলছি না সব মিথ্যা। বাস্তবতা আছে। হামলা হবে। কিন্তু আমরা এতে জড়িত নই। দয়া করে তারা যেন নির্দিষ্টভাবে বলে কারা জড়িত ছিল, আমরা ব্যবস্থা নেব।
আল জাজিরা: জামায়াত তো বিশাল নেতিবাচক ঐতিহাসিক বোঝা বহন করছে, তাই না? ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে জামায়াতের বিরুদ্ধে। আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ নিহত, ৩ লাখ নারী ধর্ষিত হয় পাক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা। আপনার অনেক নেতা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। এটা কি খুবই অন্ধকারময় উত্তরাধিকার নয়?
শফিকুর রহমান: হ্যাঁ, আপনি আমাকে অনেক কঠিন প্রশ্ন করছেন। এটাও একটি। দয়া করে অতীতে তাকান। তখন কী হয়েছিল? জামায়াতে ইসলামী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা কোনো সশস্ত্র বাহিনী ছিল না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা, স্বাধীনতার বিরোধিতা করা নয়। তখন পাকিস্তান ছিল ঐক্যবদ্ধ। কেন আমরা এটা করেছিলাম? তখন জামায়াতের নেতারা মনে করেছিলেন, ভারতের সাহায্যে যদি পাকিস্তান ভেঙে যায় বা স্বাধীনতা হয়, তাহলে সেটা বাংলাদেশের ওপর আরেকটি আধিপত্য হবে— যা আমরা গত ৫৪ বছর ধরে দেখছি।
আল জাজিরা: স্যার, আমি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করছি না। আমি যুদ্ধাপরাধ নিয়ে প্রশ্ন করছি। শফিকুর রহমান : হ্যাঁ, আমি এদিকে আসছি। আমরা সেই সময়ে কোনো অপরাধে জড়িত ছিলাম না।
আল জাজিরা: আপনি বলবেন, আদালত কেন এমন রায় দিয়েছে? মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কেন হলো? শফিকুর রহমান : এটা সম্পূর্ণ বিকৃত ও বিতর্কিত বিচার ছিল। এটা ছিল ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা।
আল জাজিরা: কেন এবং কীভাবে?
শফিকুর রহমান: একই আদালত, ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর আমাদের একজন নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের একটি মুলতবি মামলার রায় দিয়েছে এবং তারা আগের রায়ের ওপর অনেক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং অযৌক্তিক ছিল।
আল জাজিরা: ঠিক আছে, কিন্তু আমি কি এটা জিজ্ঞেস করতে পারি? ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে, কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে নৃশংসতার যোগসূত্রের অস্বীকারযোগ্য প্রমাণ নেই কি? আন্তর্জাতিক আইনজীবী কমিশন ১৯৭২ সালে বলেছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের কয়েক দিন আগে শত শত বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল একটি প্যারামিলিটারি বাহিনী, যা জামায়াতের অংশ বলে বিশ্বাস করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ১৯৭১ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নতুন প্যারামিলিটারি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে জামায়াতের অনুসারীরাও ছিল। আমি এমন আরও অনেক সূত্র উল্লেখ করতে পারি।
শফিকুর রহমান: হ্যাঁ, আমি এই বিষয়ে আসছি। দেখুন। সেই সময়ে কিছু বাহিনী ছিল— সেনাবাহিনী ছিল, প্যারামিলিটারি ছিল। এগুলো পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বারা, অন্য কারও দ্বারা নয়, কোনো সংগঠনের দ্বারাও নয়।
আল জাজিরা: কিন্তু জামায়াত তো সেই প্যারামিলিটারির অংশ ছিল, যারা এসব নৃশংসতা চালিয়েছে। শফিকুর রহমান : আমি আপনাকে উত্তর দিচ্ছি। যদি কেউ তখন কোনো নৃশংসতায় জড়িত থাকত, তাহলে কেন তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের হয়নি? এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের কোনো থানায় বা স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও হয়নি। কেন হয়নি?
আল জাজিরা: তাহলে আপনি কি বলছেন এসব বিবরণ সবই মিথ্যা? কেন ৪০ বছর পর এগুলো সামনে এলো? তাহলে কি আপনি বলছেন আন্তর্জাতিক আইনজীবী কমিশন, নিউ ইয়র্ক টাইমস— সবই মিথ্যা?
শফিকুর রহমান: তখন প্রমাণগুলো ছিল নতুন, সাক্ষীরা জীবিত ছিলেন এবং স্মৃতি ছিল খুবই স্পষ্ট। কিন্তু একজন নেতাকেও এ জন্য অভিযুক্ত করা হয়নি। কেন?
আল জাজিরা: কখনও কখনও, মি. রহমান, কোনো দেশের অতীত অপরাধের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বহু বছর লাগে। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে বলে ব্যক্তিদের বা সংগঠনকে অপরাধ থেকে মুক্ত করে না।
শফিকুর রহমান: তখন শেখ মুজিব প্রায় চার বছর দেশ শাসন করেছিলেন। এবং তিনি যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন এবং তারা সবাই পাকিস্তানি পুরুষ ছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের কেউ ছিলেন না।
আল জাজিরা: স্যার, আপনি গত বছর নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন— যদি ১৯৪৭ থেকে জামায়াতে ইসলামী কারও ক্ষতি করে থাকে, আমি সব ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাই।
শফিকুর রহমান: হ্যাঁ।
আল জাজিরা: এতে মনে হচ্ছে আপনি স্বীকার করছেন যে একটি সমস্যা আছে। জামায়াতের কিছু সম্পৃক্ততা বা জড়িত আছে। না হলে আপনি কেন এমন বলবেন? শফিকুর রহমান : এটা অনুমানের বিষয় নয়। বরং আমরা মানুষের দ্বারা গঠিত সংগঠন। তাই মানুষ ভুল করতে পারে।
আল জাজিরা: ৭১-এর নৃশংসতাও? শফিকুর রহমান: ভুল আর নৃশংসতা এক নয়। আমি কখনও নৃশংসতা বলিনি। আমি বলেছি ভুল। তাই আমি ক্ষমা চাই এবং এটা চালিয়ে যাব।
আল জাজিরা: নির্বাচনের আগে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক, যা সাধারণত দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সম্পর্ক। কিন্তু তা নাটকীয়ভাবে খারাপ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ চাইছে ভারত যেন শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠায়। আর ভারত এখন পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আপনি যদি ক্ষমতায় আসেন, স্যার, তাহলে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করবেন?
শফিকুর রহমান: আমরা ভারতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপ করব কারণ তারা আমাদের প্রতিবেশী। আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আমরা কখনও প্রতিবেশীদের অস্বস্তি দিই না। একইভাবে আমরা আশা করব তারা আমাদেরও স্বস্তি দেবে। আমাদের সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে।
আল জাজিরা: কিন্তু যদি ভারত সরাসরি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করে? শফিকুর রহমান: কোনো সমস্যা নেই। আমরা বলব আরও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হবে, অন্য কোনোভাবে নয়।
আল জাজিরা: ভারত কি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে? আমি জানি আপনি একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এসব বিষয়ে কি কোনো আলোচনা হয়েছিল?
শফিকুর রহমান: শুধু একজন কূটনীতিক আমার অসুস্থতার পর আমাকে দেখতে এসেছিলেন। আর সেটা কোনো রাজনৈতিক বৈঠক ছিল না। তাই আমি এসব বিষয়ে আলোচনা করিনি।
আল জাজিরা: শেষবার যখন আপনি এবং বিএনপি ক্ষমতায় ছিলেন, ভারত বলেছিল বাংলাদেশ যেন ভারতবিরোধী বিদ্রোহীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে। আর একই অভিযোগ এখন আবার করা হচ্ছে।
শফিকুর রহমান: ভারতবিরোধী হওয়ার প্রশ্ন নয়। বরং বলুন মানুষ প্রো-বাংলাদেশি। আমরা প্রো-বাংলাদেশি এবং প্রত্যেক নাগরিকের উচিত প্রথমে নিজের দেশের প্রতি অনুগত থাকা।
আল জাজিরা: আপনি কি পাকিস্তানের প্রতি বেশি ঝুঁকে আছেন না?
শফিকুর রহমান: কোনো প্রশ্নই নেই।
আল জাজিরা: আপনার কি তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই?
শফিকুর রহমান: আমাদের কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি ঝোঁক নেই। বরং আমরা সবার সঙ্গে ন্যায়সংগত সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আল জাজিরা: আমার শেষ প্রশ্ন আপনাকে, স্যার। এই নির্বাচন পরিবর্তনের জন্যই, বিশেষ করে লাখো তরুণ যারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের অংশ নেয়। তারা পরিবর্তন দেখতে চায়। কিন্তু আমরা যা কিছু আলোচনা করেছি— নারীদের প্রসঙ্গ, সংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গ, সবকিছু আপনি কি বিশ্বাস করেন যে জামায়াত বাংলাদেশে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে?
শফিকুর রহমান: জনগণকে বিষয়টি সিদ্ধান্ত নিতে দিন। আমি আপনাকে একটি সহজ উদাহরণ দিতে পারি। ঠিক আছে। পাঁচটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। সেখানে মেয়েরা আছে, ছেলেরাও আছে এবং তারা যথেষ্ট সচেতন। তারা ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষে রায় দিয়েছে। কেন? আমাদের ছাত্র সংগঠনের পক্ষে? ইসলামী ছাত্রশিবির। কেন? কেন? তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা তাদের মাধ্যমে পূর্ণ হবে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাদের মেয়েদের মর্যাদা, সম্মান ও গোপনীয়তা ইসলামী ছাত্রশিবির রক্ষা করবে। এই খাতের সচেতন মানুষ জাতিকে যে বার্তা দিয়েছে, আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি।
( আল জাজিরার সাক্ষাৎকার ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত)










Discussion about this post