নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন, অথচ এই অন্তিম সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক সংক্রান্ত চুক্তি এবং চীন ও জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের সরকারি তোড়জোড় নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। একটি বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি এই ধরণের দীর্ঘমেয়াদী এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নাকি এটি নির্বাচিত সরকারের জন্য রাখা উচিত ছিল—তা নিয়ে এখন দেশজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনা। বিশেষ করে এসব চুক্তির গোপনীয়তা এবং অংশীজনদের এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের প্রশাসনিক নৈতিকতাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। খবর বিবিসি বাংলার।
বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ইস্যু নিয়ে। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশকে সময় দিয়েছে এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ওই দিনই বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের এমন ‘তাড়াহুড়ো’ দেখে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে এমন কোনো চুক্তিতে সই না করে নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করাই ছিল অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা খাতের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত বা ‘পলিসি ডিসিশন’ নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা। তাদের সাফ কথা, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বা একতরফা কোনো চুক্তি করা হলে তা পরবর্তী সরকার মেনে নেবে না।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই রাজনৈতিক বিরোধের ফলে এসব আন্তর্জাতিক চুক্তির ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে এসব চুক্তির ‘নন ডিসক্লোজার’ বা অপ্রকাশ্য শর্তগুলো নিয়ে। কোনো ধরণের গণশুনানি বা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণে এর স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়গুলোকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলা হলেও, ঠিক কী কী শর্তে এসব চুক্তি হচ্ছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। ফলে এক ধরণের বড় অনাস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ীক অংশীজন এবং দেশের জনগণকে অন্তত মূল বিষয়গুলো জানানো একান্ত প্রয়োজন ছিল। কারণ একটি চুক্তি কেবল বর্তমানের বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতিনিধিরাই এটি বাস্তবায়ন করবে।
জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এমন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন বলেও মনে করেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক দিনে এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতির দিকে যায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা










Discussion about this post