নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর একটি আবাসিক ভবনকে ব্যবসায়িক কার্যালয় হিসেবে দেখিয়ে বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে ট্রেড, আমদানিকারক ও বিন লাইসেন্স। আর সেই লাইসেন্সের আড়ালে চলছে অবৈধ বিদেশি মদ আমদানি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এমন একটি বড় চালান আটক করা হয়। কিন্তু চারদিন অতিবাহিত হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো মামলা হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, কাস্টমস ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষের একাংশকে ম্যানেজ করে পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কাগজে-কলমে আমদানিকরক প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ (বিন নম্বর: 006343498-0102)। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর নথিতে এর ঠিকানা দেওয়া হয়েছে: বাসা# ১০, রোড# ০১, কালিয়ারটেক, নিশাদনগর, তুরাগ থানা, ঢাকা-১২৩০।
কিন্তু উল্লেখিত ঠিকানায় গিয়ে ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বা সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। এটি সম্পূর্ণ একটি আবাসিক ভবন। যা কোনোভাবেই বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য অনুমোদিত নয়। আবাসিক ভবনকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে ভ্যাট নিবন্ধন বা আমদানিকারক লাইসেন্স নেওয়া দেশের প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এসময় স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সুজন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারীকে মদ ব্যবসায়ী হিসেবে এক নামে সবাই চেনে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৩ মে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চীন থেকে আসা কনটেইনার (SELU4389099) আটক করে। আমদানিকারক ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ নথিতে প্রিন্টার আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রিন্টারের বডি ও কার্টনের ভেতরে সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ অবৈধ বিদেশি মদ উদ্ধার করেন। এই চোরাচালানের কাজে সরাসরি সহায়তা করেছে সিএন্ডএফ এজেন্ট ‘আবেদ কর্পোরেশন’। চালানটি আটক হওয়ার বেশ কিছুদিন পার হলেও এখনো কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবেদ কর্পোরেশনের মালিক শামসুল আলম এবং সুজন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে মামলা ছাড়াই বা দুর্বল অভিযোগে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, এদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। তবে প্রক্রিয়াগত কারণে একটু দেরি হচ্ছে’।
ভিতরে ভিতরে কাস্টমসকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে আবেদ কর্পোরেশন ও সুজন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এমন প্রশ্নে সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, ‘প্রিন্টারের ভিতরে মদ পাওয়া গেছে এখানে ন্যূনতম ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। মামলা তো হবে হবেই। লাইসেন্সও বাতিল হবে’।
নির্মাণাধীন আবাসিক ভবনকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আমদানি কারক লাইসেন্স নেয় ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’। তবে লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতি ও চোরাচালানের ঘটনায় ঢাকা (উত্তর) কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেটের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
লাইসেন্স বা ‘বিন’ (BIN) প্রদানের আগে নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শন করার কথা। কিন্তু একটি আবাসিক ভবনকে তারা কীভাবে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যয়ন করলেন? তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ০৯/০৯/২০২৪ তারিখে ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’কে এই লাইসেন্স প্রদান করার পেছনে মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগসাজশ থাকার সন্দেহ করা হচ্ছে। ভুয়া ঠিকানায় লাইসেন্স পাওয়ার কারণেই এই চক্রটি আন্তর্জাতিক চোরাচালান করার সাহস পেয়েছে, যার দায়ভার কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর) কোনোভাবেই এড়াতে পারে না বলে মনে করছেন সিএন্ডএফ এজেন্ট ও বৈধভাবে ব্যবসা করা আমদানিকারকদের অনেকেই।
আবাসিক ভবনকে ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে আমদানিকারক লাইসেন্স বা ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণ করা দেশের একাধিক আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথমত, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ১১১ ও ১১৭ অনুযায়ী, ভুয়া তথ্য প্রদান করে বা আসল তথ্য গোপন করে মূসক নিবন্ধন বা ‘বিন’ গ্রহণ করা কর ফাঁকি ও জালিয়াতির শামিল। দ্বিতীয়ত, কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৬৪ ও ১৭৩ অনুযায়ী, অসত্য তথ্য দিয়ে বা জালিয়াতির মাধ্যমে কোনো লাইসেন্স নেওয়া এবং তার অধীনে পণ্য আমদানি করা দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া, ভবনটির আবাসিক চরিত্র পরিবর্তন করে কমার্শিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০০৮ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই গুরুতর জালিয়াতি ও অপরাধের কারণে আমদানিকারক ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ এবং এর স্বত্বাধিকারীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এছাড়া মিথ্যা ঘোষণা ও চোরাচালানের দায়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর বিরুদ্ধে মামলা হলে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এর ২৫-বি ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে আমদানির এই চক্রের মূল হোতা এবং তাদের সহায়তাকারী কাস্টমস ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনবিআর-এর জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন মনে করছেন সিএন্ডএফ এজেন্ট ও বৈধভাবে ব্যবসা করা আমদানিকারকরা।










Discussion about this post