আবুল হোসেন খন্দকার:
তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানের ভারত ত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তবে এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আবারও তুলে ধরেছে—প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক কি শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি পারস্পরিক সম্মান ও আচরণের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটবে?
ভারত প্রায়ই বলে থাকে যে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং ঐতিহাসিক। তারা ২০ কোটিরও বেশি বাংলাদেশির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু বক্তব্যই যথেষ্ট নয়; বাস্তব আচরণই শেষ পর্যন্ত সেই বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।
রাষ্ট্রের মর্যাদা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। একটি দেশের প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের প্রতি আচরণ অনেক সময় পুরো দেশের জনগণের কাছে একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে প্রতিফলিত হয়। ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা, সৌজন্য এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে তীব্র মতপার্থক্য বা দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার রক্ষা করেছে। বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধকে একপাশে রেখে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করেছে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল তার সামরিক বা অর্থনৈতিক সামর্থ্যে নয়; বরং তার উদারতা, পরিপক্বতা এবং অন্য রাষ্ট্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যেও প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ ও সরকারের সহায়তার কথা বাংলাদেশের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। সেই ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে হলে উভয় দেশকেই সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। বন্ধুত্ব কখনো একতরফা হতে পারে না; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে অনেক যৌথ চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং জনগণের কল্যাণে দুই দেশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাই এমন কোনো পদক্ষেপ বা আচরণ কাম্য নয়, যা অযথা ভুল বোঝাবুঝি বা অস্বস্তির জন্ম দেয়।
বন্ধুত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের সময়ে। মুখের কথায় নয়, আচরণে; প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তবতায়; আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় নয়, পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও তার ব্যতিক্রম নয়। দুই দেশের জনগণ আশা করে, বন্ধুত্বের যে বার্তা উচ্চারিত হয়, তার প্রতিফলন বাস্তব আচরণেও ঘটবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষী—বন্ধুত্বের প্রকৃত পরিচয় কথায় নয়, আচরণেই প্রকাশ পায়।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ










Discussion about this post