নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি অভিযোগ করেন, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনাসহ গণহত্যায় অভিযুক্তদের আশ্রয় দিয়ে ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ সরকার বারবার তাগিদ দিলেও ভারত তা আমলে নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরদিনই আদানি পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের নাটক সাজানো হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও প্রজন্ম দলের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনের সহসভাপতি কর্নেল (অব.) জয়নুল আবেদীন, আনিসুজ্জামান খোকন, মেজর (অব.) মিজানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
রিজভী বলেন, ‘আপনারা (ভারত) আমাদের বন্ধু দেশ দাবি করেন, আমরাও বলি। কিন্তু কেমন বন্ধু আপনারা? যিনি একাত্তরের পর ১ হাজার ৪০০ তরুণ-কিশোর, ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকের রক্ত পান করেছেন, সেই রক্তপিপাসু শেখ হাসিনাকে আপনারা আশ্রয় দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে যারা গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং গণহত্যা চালিয়েছে, তারাও ভারতে পালিয়ে রয়েছে। আদালতের পরোয়ানা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার তাদের বারবার ফেরত চাইলেও ভারত তা করছে না।
ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রিজভী বলেন, ‘আপনারা যদি শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এক সাবেক মেজরকে ধরে শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করতে পারেন, তাহলে ১ হাজার ৪০০ মানুষ হত্যার জন্য অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে কেন হস্তান্তর করছেন না? তাকে নিয়ে আপনাদের উদ্দেশ্য কী?’
তিনি আরও বলেন, ‘মুখে বন্ধুত্বের সুমধুর কথা বললেও ভেতরে ভেতরে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে আপনারা চক্রান্তের জাল বুনছেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, একজন স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে ব্রিকসে সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে সাইডলাইনে বসার মতো করে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তার ভাষ্য, একজন স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার প্রতীক।
রিজভী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসে যাবেন না বলার পরের দিনই আদানি পাওয়ার প্লান্ট ঘোষণা দিল তাদের একটি ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। এই সুইচ তো ভারতের ঝাড়খণ্ডে। তারা যখন ইচ্ছা বন্ধ করে। এই কূটকৌশল বোঝার জন্য ব্যারিস্টারি পাস বা পিএইচডি করতে হয় না, দেশের সাধারণ মানুষও তা বোঝে।’
বিগত সরকারের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, গত ১৬ বছরে দেশে লুণ্ঠন, ব্যাংকের টাকা পাচার, গুম ও গুপ্তহত্যা চলেছে। শীতলক্ষ্যা, পদ্মা ও বুড়িগঙ্গায় লাশের মিছিল ভেসেছে।
তার দাবি, সেই পরিস্থিতি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লব এবং পরে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ে সরকার গঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আজকে পার্লামেন্টে এবং বাইরে বিরোধী দল সকাল-সন্ধ্যা সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও গালিগালাজ করছে। কিন্তু কোনো বিরোধী নেতা কি গুম হয়েছেন? কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়েছে? হয়নি। কারণ জনগণের বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল অঙ্গীকার।’
বর্তমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়ে রিজভী বলেন, এটি সরকারের তৈরি কোনো সংকট নয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে এ বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এর মধ্যেও সরকার সংকট মোকাবিলায় দিনরাত চেষ্টা করছে। বিকল্প হিসেবে পূর্ব এশিয়ার দেশ-মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির মাধ্যমে শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালিতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রিজভীর দাবি, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শেখ হাসিনার আমলের তুলনায় প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণেই দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি মধুর ক্যান্টিন নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রিজভী। তিনি বলেন, একাত্তরের অর্জনকে মুছে ফেলার কোনো অপচেষ্টা দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
রিজভী বলেন, “সম্প্রতি ডাকসুসহ কয়েকটি জায়গায় অপতৎপরতা দেখা যাচ্ছে। মধুর ক্যান্টিনকে ‘বিশ্রাম মঞ্জিল’ বানানোর চেষ্টা শহীদ মধুর আত্মত্যাগের প্রতি চরম অপমান।”
তিনি আরও বলেন, ‘মধুর ক্যান্টিনের মধু একাত্তরের শহীদ। একাত্তরের পরাজিত শক্তি যদি ভিন্ন কায়দায় এর প্রতিশোধ নিতে চায়, তাহলে এ দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা তা প্রতিহত করবে।’










Discussion about this post