নিজস্ব প্রতিবেদক
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে টানা দুই দিন ধরে চলা বিক্ষোভে অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলোতে আসামি করা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার মানুষকে। এছাড়া, প্রক্রিয়াধীন আছে আরও ৬ মামলা।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে এ তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
তিনি জানান, পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে সংঘর্ষ, পুলিশের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ১৩ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬০ জন।
এসব ঘটনায় আরও অন্তত ৬টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এদিকে সোমবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গে করতে ধাওয়া দেয় পুলিশ। পাশাপাশি কয়েকটি টিয়ারশেল ছোড়ে তারা। পরে মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকায়ও শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের হটিয়ে দেয় পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রূপনগর এলাকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দলে দলে শ্রমিকরা মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসতে থাকেন। তারা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের টানা দুদিনের বিক্ষোভ-সংঘর্ষের পর আজ সোমবার সকাল থেকে সতর্ক অবস্থানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়। গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মিরপুর-১০ নম্বর ও আশপাশের এলাকার সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সড়কে কোনো বিঘ্ন দেখা যায়নি। পথচারী ও সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখা গেছে।
সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরিতে কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত। এসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।
সোমবারও কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনের নামে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে একটি পক্ষ সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।
আন্দোলনে শ্রমিক নন, এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রকৃত কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতা নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক, তা চাইবেন না। সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলে সরকার বিশ্বাস করে। তবে কোনো শ্রমিক সংগঠনের নেতা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাদেরও সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এদিন সকাল ৮টার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। এতে আশপাশের এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানেগ্যাস ব্যবহার করে। পরে শ্রমিকরাও বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত দুপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে।
একপর্যায়ে দুপুরের দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রো স্টেশন বেলা ১১টা ৩৮ মিনিট থেকে ১টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল।
এর আগের দিন শনিবারও একই দাবিতে মিরপুরে সড়ক অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকরা। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।









Discussion about this post