স্পোর্টস ডেস্ক
বিশ্বকাপের শেষ রাত। নিউইয়র্কে আলো জ্বলবে, কোটি কোটি চোখ স্থির থাকবে একটি ম্যাচের দিকে। কিন্তু এই ফাইনাল শুধু স্পেন বনাম আর্জেন্টিনার লড়াই নয়। এটি দুই ভিন্ন যাত্রার, দুই ভিন্ন শক্তির, দুই ভিন্ন ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প।
একদিকে এমন এক স্পেন, যাদের হারানো যেন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে এমন এক আর্জেন্টিনা, যারা জয়ের অভ্যাসকে নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত করেছে। প্রশ্ন একটাই। অপ্রতিরোধ্য স্পেন, নাকি ছোঁয়ার বাইরে থাকা আর্জেন্টিনা?
স্পেনের বর্তমান যাত্রা শুরু হয়েছিল এক পরাজয় দিয়ে। ২০২৪ সালের মার্চে লন্ডন স্টেডিয়ামে কলম্বিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারের পর যেন বদলে যায় পুরো গল্প। সেই হারের পর থেকে স্বাভাবিক সময় কিংবা অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে টানা ৩৭ ম্যাচে হারেনি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা ছুঁয়ে ফেলেছে ইউরোপের সর্বকালের অন্যতম সেরা রেকর্ড। পরিসংখ্যান সংস্থা অপটার হিসাবে, ইতালি ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যে ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়েছিল, স্পেনও এখন সেই উচ্চতায়।
তবে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। স্পেন ২০২৫ নেশন্স লিগের ফাইনালে পর্তুগালের কাছে টাইব্রেকারে হেরেছিল। যদিও ফিফার পরিসংখ্যানে টাইব্রেকারের হারকে আনুষ্ঠানিক পরাজয় ধরা হয় না, তবু ইতালির সেই ধারাবাহিকতা ছিল সত্যিকার অর্থেই নিখুঁত অপরাজিত।
স্পেনের ইতিহাসও যেন তাদের পক্ষেই কথা বলে। ইউরোপের কোনো দল অন্তত ২৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার যে ১১টি অধ্যায় লিখেছে, তার ছয়টিই স্পেনের। আরও বিস্ময়কর বিষয়, এর পাঁচটি এসেছে গত ২২ বছরের মধ্যে। যেন দুই দশক ধরে ইউরোপীয় ফুটবলে আধিপত্যের ক্যানভাসে নিজের রঙ ছড়িয়ে যাচ্ছে লা রোজা।
এই যাত্রায় ব্যক্তিগত অর্জনের গল্পও কম নয়। মিডফিল্ডার ফাবিয়ান রুইস স্পেনের হয়ে ৪৯টি ম্যাচ খেলেছেন, অথচ কোনো হার দেখেননি। যদিও বর্তমান ৩৭ ম্যাচের অপরাজিত ধারায় সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে কাটানো ফুটবলার তিনি নন। বরং এই অভিযানের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন মার্ক কুকুরেয়া। তার পরেই আছেন উনাই সিমন, আইমেরিক লাপোর্তে, লামিন ইয়ামাল এবং মিকেল ওয়ারিয়াসাবাল। এই পাঁচজনকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি আস্থা রেখেছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
মজার বিষয় হলো, এই ৩৭ ম্যাচে স্পেন ব্যবহার করেছে ৬২ জন ফুটবলার। সংখ্যাটি শুনে মনে হতে পারে কোচ হয়তো স্থায়ী একাদশ খুঁজে পাননি। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। অন্তত ২০টি ম্যাচ খেলা ১৫ জনের মধ্যে ১০ জনই খেলেছেন বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের শুরুর একাদশে। চারজন নেমেছেন বদলি হিসেবে, আর মার্তিন জুবিমেন্দি ছিলেন বেঞ্চে। অর্থাৎ, গভীর স্কোয়াডের ভেতরেও ছিল একটি সুস্পষ্ট কাঠামো।
এই দীর্ঘ অপরাজিত যাত্রায় শুধু অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল নয়, স্পেন হারিয়েছে ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং পর্তুগালের মতো ফুটবল পরাশক্তিকেও।
তবে ফাইনালের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টানা ১৪ ম্যাচ অপরাজিত। শুধু অপরাজিতই নয়, এই ১৪টি ম্যাচের প্রতিটিতেই জয় তুলে নিয়েছে তারা। যদিও স্পেনের শেষ পরাজয়ের পর এই সময়ের মধ্যে আর্জেন্টিনা তিনবার হেরেছে, তবু বড় মঞ্চে নিজেদের সামলে নেওয়ার ক্ষমতা তারা বহুবার প্রমাণ করেছে।
ইতিহাসও তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দল কখনো ৩৬ ম্যাচের বেশি অপরাজিত থাকতে পারেনি। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ব্রাজিল টানা ৩৬ ম্যাচ হারেনি এবং সেই সময়ে বিশ্বকাপও জিতেছিল। পরে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আর্জেন্টিনাও সেই রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলে। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হারে সেই ধারাবাহিকতা থেমে গেলেও, তার জবাব দিয়েছিল বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে।
তাই এবারের ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়। এক পাশে ৩৭ ম্যাচ ধরে না হারার আত্মবিশ্বাস। অন্য পাশে টানা ১৪ জয়ের অদম্য বিশ্বাস। এক পাশে ইতিহাসের দীর্ঘ রেখা। অন্য পাশে বর্তমানের দুর্নিবার গতি। ফুটবল কখনো শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়। আবার পরিসংখ্যানও কখনো পুরোপুরি মিথ্যা বলে না।
রবিবারের রাত তাই ঠিক করে দেবে, শেষ হাসিটা কার। অপ্রতিরোধ্য স্পেন, নাকি স্পর্শের বাইরেই থেকে যাওয়া আর্জেন্টিনা।










Discussion about this post