আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘মহাসমাবেশ ও বিক্ষোভ’ কর্মসূচি ডেকেছে তেলাপোকা বা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে ডাকা এই বিক্ষোভ সফল করতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে সংগঠনটি। কিন্তু, দিল্লিতে পৌঁছানো মাত্রই দলটির শীর্ষ তিন নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভে যোগ দিতে মুম্বাই একটি বিমানে করে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছান এই তিন তরুণ নেতা। কিন্তু, তাদের বহনকারী বিমানটি রানওয়েতে অবতরণ করা মাত্রই বিমানে উঠে তাদের আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আজ শনিবার বেলা ১০টার দিকে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল ককরোচ জনতা পার্টি। দিল্লি পুলিশ এ কর্মসূচির অনুমতি না দিলেও সিজেপি জানিয়েছিল, কর্মসূচি যথাসময়েই শুরু হবে।
সেই কর্মসূচিতে যোগ দিতেই উড়োজাহাজে চেপে মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লি পৌঁছান অভিজিৎ, সৌরভ এবং আশুতোষ। নয়াদিল্লির স্থানীয় সময় বেলা ১০টা ১৯ মিনিটে অবতরণ করে তাদের ফ্লাইট এবং তার পরপরই আটক হন তারা।
এর আগে, পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে বিক্ষোভে যোগ দিতে চাওয়ায় গুরুগ্রামে নিজ বাসভবন থেকে আটক হন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিক্ষোভ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এরই মধ্যে রাজধানীজুড়ে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। রাজধানী জুড়ে চলছে ব্যাপক ধরপাকড়; বিভিন্ন এলাকা থেকে এ পর্যন্ত আটক করা হয়েছে চার শতাধিক ব্যক্তিকে।
এই বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে দিল্লির যন্তরমন্তর ও তার চারপাশের ৪ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত যন্তরমন্তর ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে।
সেইসঙ্গে রাজধানী ও তার সংলগ্ন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে যেন লোকজন সিজেপির কর্মসূচিতে যোগ দিতে না পারে, সেজন্য নয়াদিল্লির ৪৫টি মেট্রোস্টেশনের সবগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে ২৫০টি ট্রেন।
দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থাও কয়েকগুণ জোরদার করা হয়েছে। বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার সড়কে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। শেষ দিকের কয়েকটি স্তর ঝালাই করে জোড়া লাগানো হয়েছে, যাতে সেগুলো ভেঙে পার হওয়া আরও কঠিন হয়।
সংবেদনশীল স্থানগুলোতে বসানো হয়েছে লাউডস্পিকার। এগুলোর মাধ্যমে রেকর্ড করা ঘোষণায় জানানো হচ্ছে, প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। লোকজনকে বিক্ষোভে জমায়েত না হওয়া, স্লোগান না দেয়া, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা না চালানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোকেও (আরডব্লিউএ) জানাতে বলা হয়েছে যে বিক্ষোভের অনুমতি নেই। বিক্ষোভে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে আসা ব্যক্তিদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন লজ ও হোটেলেও তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। হোটেল ব্যবস্থাপকদের অতিথিদের বিক্ষোভে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করতে বলা হচ্ছে। এছাড়া, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেন এমন ব্যক্তিদের এবং সম্পত্তির মালিকদেরও বিক্ষোভে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছেন— এমন ব্যক্তিদের কাছে তাদের সম্পত্তি ভাড়া না দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করেছে দিল্লি পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে যন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান। দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এই এলাকায় ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি সদস্য মোতায়েন করা হবে। ফলে এলাকাটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত অঞ্চলে পরিণত হবে।
নজরদারিও জোরদার করা হচ্ছে। নয়াদিল্লি জেলার বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে অডিও রেকর্ডিংয়ের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হবে এগুলোর মাধ্যমে।
কড়া নজর রাখা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে। প্রস্তাবিত সমাবেশ সংক্রান্ত অনলাইন পোস্ট ও বার্তাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং খবর অনুযায়ী, ২০০ জনেরও বেশি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছেন।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোতে পুলিশের অসদাচরণ ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠায় এবারের বিক্ষোভ মোকাবিলার প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
ঘটনাগুলো বিভিন্ন দিক থেকে নথিবদ্ধ করতে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ দায়িত্বে থাকা অন্য সদস্যদেরও বডি ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে ধারণ করতে শত শত আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের আশা, এসব ফুটেজের মাধ্যমে ঘটনার ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে, যাচাইযোগ্য প্রমাণ দিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি মোকাবিলা করা যাবে এবং কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্তে সহায়তা পাওয়া যাবে।









Discussion about this post