নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত দিন জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি থাকবে, তত দিন আওয়ামী লীগও থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নাম নিয়ে রাজনীতি করার তিনি ঘোরবিরোধী। একই সঙ্গে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি ঔপনিবেশিক ‘অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থার জায়গায় নতুন ‘গঠনতন্ত্র’ প্রণয়ন এবং গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করাই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের একমাত্র পথ।
আজ রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্জন-ব্যর্থতার মূল্যায়ন নিয়ে ‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংলাপে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ফরহাদ মজহার এ কথা বলেন। এ সংলাপের আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি।
বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রথম একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই জাতীয় অর্জনের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস বা দর-কষাকষি করা যাবে না, এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও নয়। তিনি বলেন, ‘আমি বারবার একটা কথা বলেছি, যদিও তাঁরা অনেকে রাগ করেছেন—আমি বলেছি, যত দিন জামায়াতে ইসলামী থাকবে, তত দিন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ থাকবে। আমি জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি করার ঘোরবিরোধী। কারণ, ইসলাম আমাদের ধর্ম। তার নীতিগত ও নৈতিক দিক একটি নতুন রাষ্ট্র ও নতুন সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
গঠনতন্ত্রের পক্ষে যে যুক্তি দিলেন ফরহাদ মজহার:
১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই।’ সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে এক বাক্যে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক বলা হয়েছে, কিন্তু ঠিক পরের বাক্যে সংবিধান বা আইনি দলিলকে জনগণের ওপরে স্থাপন করে জনগণের সার্বভৌমত্বকে নাকচ করা হয়েছে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস টেনে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘‘তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে এলএফওর (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ীরা দেশে ফিরে এসে গণপরিষদ দাবি করে এই সংবিধান চাপিয়ে দিয়েছিল। ‘সংবিধান’ ও ‘গঠনতন্ত্র’-এর আইনি পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জনগণ সংবিধানের ঊর্ধ্বে, জনগণ সংবিধানের অধীন নয়। জনগণ চাইলে যখন খুশি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারে। কনস্টিটিউশন বা সংবিধান শব্দটি কলোনিয়াল শাসকেরা ব্যবহার করত লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণিকে দিয়ে গণবিরোধী শাসন চালাতে। অন্যদিকে গঠনতন্ত্র হলো জনগণ নিজেরা একত্র হয়ে সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে তা স্থির করা।’’
পূর্ণ শক্তির অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বাধা
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পরপরই রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ছিল বলে মনে করেন ফরহাদ মজহার। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) এবং বিএনপি—এই তিন শক্তি মিলে আমাদের একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেয়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত কালের কণ্ঠে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর সাক্ষাৎকারেই তার প্রমাণ মিলেছে। ৮ আগস্ট পুরোনো সংবিধান ও রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে যে সরকার গঠন করা হয়েছে, তা মূলত একটি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব।’
গণমাধ্যমের ভূমিকারও সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘‘হাসিনাহীন কিন্তু হাসিনা-ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে গঠিত এই সরকারকে সাংবাদিকেরা ভুলভাবে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ বলে প্রচার করেছেন। বাস্তবে এটি ছিল পুরোনো সংবিধানের অধীন প্রেসিডেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার, যা দিয়ে মূল সংবিধান বদলানো অসম্ভব।’’
অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতার প্রশংসা করে ফরহাদ মজহার বিএনপি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে বলেন, রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর যেন পুলিশি নির্যাতন না চালানো হয় এবং তারেক রহমান যেন তরুণদের সঙ্গে বেইমানি না করেন। বেগম খালেদা জিয়াও কখনো তরুণদের সঙ্গে বেইমানি করতে চাননি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ধর্মের নামে তাণ্ডব চালানো ও মাজার ভাঙচুরের ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘যাঁরা মাজার ভাঙছেন, ধর্মকে মানুষকে ভয় দেখানো বা অত্যাচার করার অস্ত্র বানাচ্ছেন, তাঁদের আমরা চিনি। গাজাকে ধূলিসাৎ করে রিয়েল এস্টেট বানানোর মতো এটাও একধরনের আগ্রাসন। পেট্রোডলারের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে কেউ দাবি করতে পারেন না যে তাঁরাই ইসলামের একমাত্র কর্তৃত্বের হকদার। ইসলামে কারও এই ধরনের একক কর্তৃত্ব দাবি করার সুযোগ নেই।’
গণ–অভ্যুত্থানের অর্জনকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে তুলে ধরার তীব্র বিরোধিতা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘২০ বছর ধরে যেখানে কথা বলা যাচ্ছিল না, সেখানে এখন কথা বলা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে—এটা কোনো ব্যর্থতা হতে পারে না। ব্যর্থতার গল্প না বলে এখন দেখতে হবে আগামী দিনে আমাদের কী কী করা বাকি রয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তরুণেরা যে পথ দেখিয়েছে, সেখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।’
আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ‘‘১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় চেতনাকেই ধারণ করে সামনে এগোতে হবে। তিনি বলেন, একটি সরকারের পতন ঘটানো এবং একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার বিষয়। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে কোনো সরকারই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।’’
সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান। এতে আরও সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এ বি এম খালিদ হাসান, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক সুলতানা রাজিয়া প্রমুখ।










Discussion about this post