স্পোর্টস ডেস্ক
টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার হাতছানি ছিল ফ্রান্সের সামনে। তারকায় ঠাসা দলটার পক্ষে তা খুব কঠিন বলেও মনে হচ্ছিল না। কিন্তু ডালাসে বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে পাত্তাই দিল না স্পেন। ম্যাচজুড়ে আধিপত্য দেখিয়ে স্প্যানিশরা জিতল ২-০ গোলে।
মাঠের খেলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্তেই ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে রেখেছিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
১. ইয়ামালকে দিয়ে দিনিয়ের দুর্বলতা কাজে লাগানো
স্পেনের আক্রমণের বড় অংশ তৈরি হয়েছে ডান দিক দিয়ে, যেখানে লামিন ইয়ামালের মুখোমুখি ছিলেন ফ্রান্সের লুকাস দিনিয়ে। পুরো ম্যাচে এই দ্বৈরথে বারবার পিছিয়ে থেকেছেন দিনিয়ে… কখনো গতিতে হেরেছেন, কখনো পজিশনিংয়ে ভুল করেছেন। পেনাল্টির ঘটনাতেও দেখা যায়, ইয়ামাল ঠিক সময়ে দিনিয়ের পেছনে দৌড় দিয়ে তাকে ফাউল করতে বাধ্য করেন। এই একপেশে দ্বৈরথ স্পেনকে পুরো ম্যাচে একটি নির্ভরযোগ্য আক্রমণের রাস্তা দিয়েছে।
২. মাঝমাঠে পাস কেটে আক্রমণ থামানো
দেশঁ নিজেই বলেছেন, স্পেন প্রতিপক্ষের পাস ও ইন্টারসেপশন পড়তে অসাধারণ দক্ষ। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজকে কেন্দ্র করে গড়া মাঝমাঠ শুধু বল দখলে রাখেনি, বরং ফ্রান্সের প্রতিটি বিল্ড-আপ শুরুতেই নষ্ট করে দিয়েছে। এতে এমবাপে-দেম্বেলেদের মতো আক্রমণভাগ বলই তেমন পায়নি, ফলে ফ্রান্সের আক্রমণ কখনো ছন্দ পায়নি।
৩. ধৈর্য ধরে বল দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা
ম্যাচ যত গড়িয়েছে, স্পেন ততই বল নিজেদের পায়ে রেখে ফ্রান্সকে সামনে-পেছনে দৌড়াতে বাধ্য করেছে। এতে ফ্রান্সের রক্ষণ কখনো স্থির অবস্থানে থাকতে পারেনি, শক্তিও ফুরিয়ে গেছে দ্রুত। শেষ দিকে ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের মধ্যে তাড়াহুড়ো ও বিশৃঙ্খলা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে স্পেন কেবল বল ঘুরিয়ে সময় নষ্ট করে গেছে।
৪. দ্রুত ওয়ান-টু কম্বিনেশনে রক্ষণ ভাঙা
দ্বিতীয় গোলেই ফুটে ওঠে স্পেনের প্রকৃত ধার। বাঁ দিক থেকে ডানে বল সরিয়ে নিয়ে পেদ্রো পোরোকে খুঁজে বের করা, এরপর দানি ওলমোর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে বক্সে ঢোকা এবং নিখুঁত ফিনিশ; পুরো মুভমেন্টে ফ্রান্সের রক্ষণকে একদম অসহায় দেখিয়েছে। একই ধরনের একটা বিল্ড আপ থেকে গোল পেতে পারত স্পেন, তবে সেবার অলমো বলটা মেরেছিলেন বাইরে। এই ধরনের দ্রুত, নিখুঁত কম্বিনেশন প্লে স্পেনের আক্রমণকে অনির্ভরযোগ্য নয় বরং পরিকল্পিত করে তুলেছে।
৫. লিড পাওয়ার পর খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ
২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর স্পেন খেলার ধরন পাল্টে ফেলে। আক্রমণে না ঝাঁপিয়ে বরং বল দখলে রেখে সময় পার করা, প্রয়োজনে গোলরক্ষক দিয়ে সময়ক্ষেপণ, এবং পেদ্রি-মেরিনোর মতো সতেজ পা মাঠে নামিয়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা… সবকিছুই ছিল হিসেব করা। এতে ফ্রান্স আর ম্যাচে ফেরার মতো কোনো সুযোগ বা জায়গা খুঁজে পায়নি।
সব মিলিয়ে, স্পেনের এই জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় একেবারেই। বরং এই জয় ছিল সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে কৌশল বদলানোর ফসল। দে লা ফুয়েন্তে যেমন বলেছেন, প্রায় চার বছর ধরে লালিত একটি দর্শনের প্রতিফলনই দেখা গেল ফাইনালের মঞ্চে ওঠার এই লড়াইয়ে।










Discussion about this post