নিজস্ব প্রতিবেদক
মগবাজার আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু নিয়ে দেশব্যাপী চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। অনেকে গণমাধ্যমকে ফোন করে এই ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে কর্তৃপক্ষের অবহেলা কিংবা অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশে ছয় নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. মোহসিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই রিপোর্ট প্রাপ্তির পর নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা ব্যবস্থাপনা থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছেন। এই কমিটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালক ও একজন প্রখ্যাত নিউনেটাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের সঙ্গে গতকাল সোমবার ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কোনো ধরনের অবহেলা হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তে জড়িত যেই থাকুক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ওসি জানিয়েছেন।
এদিকে সিআইডির মিডিয়া শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন সরকার বলেন, “সিআইডির একটি দল আদ-দ্বীন হাসপাতালে যে কক্ষে ৬টি নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে সেই কক্ষটি পরিদর্শন করে কিছু নমুনা সংগ্রহ করেছে। এগুলো পরীক্ষার জন্য সিআইডির তত্ত্বাবধানে পরীক্ষাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।”
এদিকে, হাসপাতালের নির্মাণ ও অবকাঠামো সংক্রান্ত ত্রুটি নিরূপণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কমিটিতে গণপূর্ত ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দুই সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তকারী দলটি হাসপাতালে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সন্তানহারা পিতা-মাতা-স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কর্তব্যরত নার্স ও চিকিৎসকদের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন।
পরে তারা জানিয়েছেন, পোস্ট অপারেটিভ যে কক্ষটিতে সিজারিয়ান অপারেশন করার পর ৫ মায়ের ছয় নবজাতককে রাখা হয়েছিল, সেই কক্ষটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ করলে বাইরে থেকে বাতাস আসার কোনো ব্যবস্থা নেই। সে কারণেই গত ২৭ মে সকালে পর পর ছয় নবজাতক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই রাতে ২ ঘণ্টার বেশি সময় পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল।
কোনো এক মহিলা শীত করছে বলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ করার জন্য কর্তব্যরত নার্সকে বলেন। তখন নার্স সেটি বন্ধ করে দেন। বন্ধ কক্ষটিতে বাইরে থেকে বাতাস আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের সংকট দেখা দেয়। তারা অক্সিজেন পায়নি। দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে।
অপরদিকে, নবজাতকদের মা ছাড়া অন্যান্য অভিভাবক ও দর্শনার্থী মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ কক্ষটিতে অবস্থান করছিলেন। ফলে অক্সিজেন কমে যায় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে অক্সিজেনের অভাবে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা ও অবহেলা ছয় নবজাতকের মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন একজন সদস্য।
এই হাসপাতালটি কম খরচে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী আনা-নেওয়া এবং অল্প খরচে সিজারিয়ান অপারেশন করার ক্ষেত্রে সুনাম রয়েছে। দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান। গতকালও এই প্রতিনিধি প্রচুর রোগী চিকিৎসাধীন এবং চিকিৎসাসেবা নিতে আসতে দেখেছেন।
তদন্ত কমিটির একজন অভিজ্ঞ সদস্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই সকল রোগীর সুচিকিৎসা ও সেবা নিশ্চিত করতে যে ধরনের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা দরকার সেখানে তার অনেক ঘাটতি রয়েছে।
আদ-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, “১৯৯৭ সালে ৩শ বেডের আদ-দ্বীন হাসপাতালটি মগবাজারে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সুনামের সহিত ধনী, গরিবসহ সমাজে সকল পর্যায়ের রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছে। হঠাৎ করে ২৭ মে রাতে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের ছয়টি নবজাতক শিশু মারা যাওয়ার ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মর্মাহত। বিষয়টি তদন্তের জন্য কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ ঘটনা কোনো অবস্থায় মেনে নেওয়া যায় না।”
এটি কোনো নাশকতা কিনা সেটিও কর্তৃপক্ষ উড়িয়ে দিচ্ছে না বলে জানান এই পরিচালক।










Discussion about this post