কায়সার হামিদ:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর জোন ৭/৩–এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) আল নাঈম মুরাদের বিরুদ্ধে অবৈধ নির্মাণে সহায়তা, অনুমোদন বহির্ভূত ভবনকে ‘বৈধতা’ দেওয়ার চেষ্টা এবং বিনিময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বহুবার অভিযোগ করেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নকশা লঙ্ঘন ও অবৈধ নির্মাণের তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে—মিনহাজ হাউজিং লিমিটেড এর অধীনে ২ নং নন্দলাল দত্ত লেন, লক্ষীবাজারে চলমান নির্মাণ প্রকল্পে রাজউক নীতিমালা ও অনুমোদিত নকশার ধারাবাহিক লঙ্ঘন ঘটছে।
একই চিত্রে দেখা মেলে ৩৪ দিনোনাথ সেন রোড গেন্ডারিয়া। স্থানীয়দের দাবি, “নির্মাণকাজ চলছে মালিকের ইচ্ছেমতো। অনুমোদিত নকশা, সেফটি স্ট্যান্ডার্ড-কোনোটাই মানা হচ্ছে না।” বিশেষত স্ট্রাকচারাল ডিভিয়েশন এতটাই গুরুতর যে ভবনটি দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
বিল্ডিং ফর রিয়েলস্টেট লিমিটেড নামক ডেভেলপার কোম্পানি পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে যেখানে রাজউকের নীতিমালা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ চলছে-১৭ নং সতীশ সরকার রোড (গেন্ডারিয়া), ৪৭/১ মালাটোলা (সূত্রাপুর), ১৪৭ ডিস্টিলারি রোড, গেন্ডারিয়া, ১৫৩/২ ডিস্টিলারি রোড, গেন্ডারিয়া, ২নং ফরাসগঞ্জ লেন। এসব জায়গায় নেই রাজউক অনুমোদন বোর্ড, নেই বাধ্যতামূলক সেফটি ব্যবস্থা। ৪০% জায়গা খোলা রাখার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তার প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হচ্ছে, ৪ বা ৬ ফুট সরু রাস্তায় ৮–১০ তলা ভবন নির্মাণ, যা পুরো এলাকাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে।
ইন্সপেক্টর মুরাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও দালাল চক্র পরিচালনার অভিযোগ প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ইন্সপেক্টর মুরাদ একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে ঘুষের লেনদেন পরিচালনা করেন। চক্রটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছে- রাকিব, পনির (মুরাদের ব্যক্তিগত ‘সহকারী’)।
অভিযোগ রয়েছে, রাকিব অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে রাজউক ইন্সপেক্টর পরিচয় দিয়ে ঘুষ আদায় করতেও জড়িত। আর পনির, যিনি একজন অফিস সহকারী পদমর্যাদার কর্মচারী, তার জীবনযাত্রা ও ব্যয় ‘গড় বেতনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’—যা স্থানীয়দের সন্দেহ আরো বাড়িয়েছে। তারা বলেন, “ঘুষের টাকায়ই এই চক্রের বিলাসী জীবনযাপন চলছে”—এমন অভিযোগ উঠেছে এলাকাবাসীর কাছ থেকে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ভূমিকম্প ঝুঁকির সময় এসব অনিয়ম জনমনে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষত পুরান ঢাকা সবচেয়ে সংবেদনশীল রেড জোন হিসেবে বিবেচিত। এমন পরিস্থিতিতে অনুমোদন বিহীন ও স্ট্রাকচারাল নীতিমালা ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণএলাকাবাসীকে চরম আতঙ্কে ফেলেছে।
পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, “ভূমিকম্প হলে এই সব ভবন প্রথমেই ধসে পড়বে। আমরা প্রতিদিন জীবনসংশয় নিয়ে থাকি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরু গলিতে নকশা বহির্ভূত ৮-১০ তলা ভবন ভূমিকম্পে ডমিনো ইফেক্ট সৃষ্টি করতে পারে যা একসঙ্গে বহু ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
তথ্য অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, আল নাঈম মুরাদ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের সুপারিশে ২০১৫ সালে রাজউকে ইমারত পরিদর্শকের চাকরি পান। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্ত করার অভিযোগ রয়েছে মুরাদের বিরুদ্ধে।
এলাকাবাসী ও নাগরিক সংগঠনগুলো বলছে, “রাজউকের কর্মকর্তারা নিজেরাই যখন দুর্নীতিতে জড়ান, তখন পুরো নগর পরিকল্পনা ধ্বংসের মুখে পড়ে।” তারা দ্রুত দুদক, রাজউকের উচ্চ পর্যায়, এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি নাগরিক অভিযোগ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার তথ্য ও এলাকাবাসীর অভিমতের ভিত্তিতে প্রস্তুত। অভিযুক্ত ইন্সপেক্টর আল নাঈম মুরাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।










Discussion about this post