নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) বিতর্কিত কিবোর্ড বাদক সুমন রেজা খানের জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল ও ড্রাগস প্রয়োগের শিকার হয়ে সংগীতশিল্পী শাহানা শানুর মর্মান্তিক মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সংগীত শাখার কিবোর্ড বাদক সুমন রেজা খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক জালিয়াতি এবং উদীয়মান শিল্পী শাহানা শানুকে (স্মরণ শাহরিন) মানসিকভাবে ব্ল্যাকমেইল ও বিষাক্ত ড্রাগস প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধান ও পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ‘স্টাফ বাদ্যযন্ত্রী’ পদে আবেদন করে পরপর দুবার লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের উৎকোচ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুমন রেজা অবৈধভাবে চাকরি বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে দুটি ভিন্ন পাসপোর্ট এবং একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করার পাশাপাশি বিনা অনুমতিতে বিদেশে অবস্থান ও কর্মস্থলে দীর্ঘ অনুপস্থিতির মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভেতরে গড়ে ওঠা এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বলি হয়েই মূলত বিটিভির তালিকাভুক্ত প্রতিশ্রুতিশীল তরুণী শিল্পী শাহানা শানু তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হন।
শিল্পী শানুর মৃত্যুর নেপথ্যে সুমনের তৈরি করা মানসিক নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন এবং চেতনাপ্রানাশক ও যৌন উত্তেজক ড্রাগস প্রয়োগের ভয়াল ব্ল্যাকমেইলের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আফতাবনগরের একটি গোপন ফ্ল্যাটে শানুকে জোরপূর্বক নিয়ে গিয়ে কোকা-কোলা বা মদের সঙ্গে বিষাক্ত ড্রাগস খাইয়ে অনৈতিক কার্যকলাপে বাধ্য করা হতো এবং পরবর্তীতে ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এদিকে সুমনের লোকদেখানো ‘দরদী বড় ভাই’ বা সহায়তাকারীর মিথ্যা দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে শানুর বৃদ্ধা মা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে মেয়ের চিকিৎসার পেছনে তাদের জমানো ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ হলেও সুমন রেজা এক পয়সাও সাহায্য করেনি। উল্টো বিটিভির সহকর্মী নীনা সামান্তার অডিও ফোনালাপ ও সিসিটিভি ফুটেজে সুমন ও শানুকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অনৈতিক ও আপত্তিকর নানা ঘটনার অকাট্য প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে, যা এই চক্রের পশুতুল্য মানসিকতারই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বিটিভি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও প্রশাসনিক নিরবতা নিয়ে সংগীতাঙ্গন ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময় নারীঘটিত কেলেঙ্কারি এবং নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পরও সুমন রেজা খানের বিরুদ্ধে নামমাত্র শাস্তি বা কেবল পদোন্নতি স্থগিত করার মতো লঘু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা এই ধরনের অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী অবৈধ জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি , পলায়ন এবং ফৌজদারি অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়নি, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। বিটিভির কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সরাসরি ছত্রছায়ায় সুমন রেজা দীর্ঘদিন ধরে এই অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায় থেকে জোরালো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়নি।
রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অবাধ বিস্তারের কারণে দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও তরুণ প্রতিভাবান শিল্পীদের ভবিষ্যৎ আজ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। একজন উদীয়মান শিল্পীর এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার চরম পতনের একটি বড় দলিল। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ শিল্পী সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে আইওয়াশ বা নামমাত্র বদলির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সুমন রেজা খান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যথায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই ধরনের অপরাধ চক্র সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরে অচিরেই আরও অনেক সম্ভাবনাময় জীবনকে চিরতরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।










Discussion about this post