বিশেষ প্রতিনিধি:
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) মেগা প্রকল্পগুলোতে কাজ না করেই ভুয়া বিল পাসের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছিল সংস্থাটির প্রভাবশালী প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে।
সরকারি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এই জালিয়াতির সত্যতা পেয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও, পতিত ফ্যাসিবাদের আমলে তা রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনা। ২০২৪ সালের রক্তাক্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বর্তমানে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, নিষিদ্ধ এই সংগঠনের প্রথম সারির এক দাপুটে নেতা হওয়া সত্ত্বেও প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফকে ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ‘ঢাকা মেট্রো’র মতো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া হয়।
নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত ২০২২ সালের আগস্ট মাসে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ইইডির মেগা প্রকল্পগুলোতে নজিরবিহীন দুর্নীতির খবর প্রচারিত হওয়ার প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নির্দেশে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর তদন্ত কমিটির প্রধান ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো: রাহেদ হোসেন স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি (স্মারক নং- ৩৭.০৭.০০০০.০০২.২৭.০১.২০২২.১০৩৮) সরকারের কাছে দাখিল করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফের সরাসরি সম্পৃক্ততায় বড় জালিয়াতির চিত্র উঠে আসে। এর মধ্যে কাফরুলের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘private secondary school development’ প্রকল্পের আওতায় ৪,০০,৪৩,১০৫ (চার কোটি ৪৩ হাজার ১০৫) টাকার চুক্তিতে ৬-তলা ভবনের কাজ চলাকালীন ২০২২ সালের ১৪ মে তদন্ত কমিটি সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখে যে ভবনের ৩য় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজই সম্পন্ন হয়নি; অথচ তৎকালীন সহকারী প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ ও তার সিন্ডিকেট কোনো বাস্তব অগ্রগতি ছাড়াই বড় অংকের ঘুষের বিনিময়ে ঠিকাদারকে ২,৩৩,৪১,০০০ (দুই কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার) টাকা অগ্রিম বিল পাস করে দেয়। তদন্ত কমিটি স্পষ্ট ভাষায় তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করে যে প্রদানকৃত বিলের বাকী কাজসমূহ বাস্তবায়িত হয়নি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। কমিটি কাজ না করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের জন্য মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দায়ী করে বিভাগীয় ও আইনগত শাস্তির সুস্পষ্ট সুপারিশ করেছিল।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সাভার জোনে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মানাধীন ১৮০ কোটি টাকার ভবন তৈরির প্রকল্পে কাজ না করেই ঠিকাদার মেসার্স পদ্মা কনস্ট্রাকশনকে অগ্রিম ২০ কোটি টাকা প্রদান করেন।
দাপ্তরিক নথিপত্র (সূত্র: বিপিপি/ইইডি/ইঞ্জি/২০২২, তারিখ: ২৭/০৭/২০২২ খ্রি.) অনুযায়ী, প্রকৌশলী আলিফ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর ইইডি শাখার আহবায়ক কমিটির শীর্ষ ১০ নম্বর প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন এবং ২০২৩ সালের ২ আগস্ট গঠিত কমিটিতেও তিনি ২ নম্বর সদস্য হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনীতি বর্তমানে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের সক্রিয় কর্মী বা নেতা রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকতে পারেন না। কিন্তু সমস্ত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, বিগত ফ্যাসিবাদের সময় তৈরি করা কালো টাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আলিফ বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন আলিফের বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলা হলেও দলীয় প্রভাবে তিনি সবসময় পার পেয়ে যান এবং ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর তিনি কিছুদিন কোণঠাসা থাকলেও ২০২৬ সালের শুরুতে এক অভিনব প্রশাসনিক চাল চালেন।
শিক্ষা প্রকৌশলীদের বিভিন্ন ফোরাম এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়েরকৃত সাম্প্রতিক অভিযোগ থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকার আগারগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নতুন প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি মেগা দরপত্র (টেন্ডার) মূল্যায়নের কাজ চলছে এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই শতকোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই নেপথ্যে প্রায় ২ কোটি টাকার অনৈতিক লবিং ও লেনদেনের বিনিময়ে ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ তাকে সাভার ও ঢাকা জেলা থেকে বদলি করে ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ঢাকা মেট্রো’ জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বসানো হয়। ইতোমধ্যে গত এপ্রিল ও মে মাসে (২০২৬) তিনি ঢাকা মেট্রোর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে একাধিক মাসিক সমন্বয় সভাও পরিচালনা করেছেন এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি অর্জিত ছুটি মঞ্জুর করিয়ে চিকিৎসার নামে বিদেশে ভ্রমণের সুবিধাও লাভ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই ইইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শাহ্ নইমুল কাদেরকে আহবায়ক করে গঠিত আওয়ামীপন্থী সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’ (ইইডি শাখা)-এর ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট গঠিত নতুন আহবায়ক কমিটিতেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে রাখা হয়। এই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে তিনি মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক প্রশাসনিক অনিয়ম ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২২ সালের তদন্তে প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ এবং ২০২৪ সালের গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের একজন শীর্ষ নেতা কিভাবে বর্তমান বাংলাদেশে ঢাকা মেট্রোর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জোনে ছড়ি ঘুরান, তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিগত ফ্যাসিবাদের দোসরদের এভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোনে পুনর্বাসন করা কেবল জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাই নয়, বরং বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতি ও সুশাসনের সদিচ্ছাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবিলম্বে এই প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পদায়ন বাতিল করে ২০২২ সালের তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে তাকে গ্রেফতার ও আইনি মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফে এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা সরকারি চাকরি করি রাজনৈতিক কোন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থাকার কোন সুযোগ আমাদের নেই। আর কাজ না করে অগ্রীম টাকা দেয়ার বিষয়ে প্রকৌশলী আলিফ বলেন, কাজ না করে অগ্রিম টাকা দেয়ার কোন সুযোগ নেই, আর কোন তদন্ত কমিটির কথা বলছেন সেটা আমার জানা নেই। তদন্ত প্রতিবেদন না দেখে কোন কিছু বলা সম্ভব না।










Discussion about this post