ক্রীড়া প্রতিবেদক :
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্চারদের গৌরবময় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ইরাকে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ওয়াল্ড রেঙ্কিং টুর্নামেন্ট থেকে ৩টি স্বর্ণ, ৩টি রৌপ্য ও ৪টি ব্রোঞ্জপদকসহ মোট ১০টি পদক অর্জন করে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয় আর্চারি দল।
রোববার (১ নভেম্বর) ভোরে দেশে পৌঁছায় বাংলাদেশ দল। এ সময় দেশে ফেরা আর্চারদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের সভাপতি এবং ওয়ার্ল্ড আর্চারি এশিয়ার সভাপতি কাজী রাজীব উদ্দীন আহমেদ চপল।
বিমানবন্দরে এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোঃ মাহফুজুল আলম খান, বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি মোঃ মনজুর আলম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তানভীর রায়হান, যুগ্ম সম্পাদক সোহেল রানা, যুগ্ম সম্পাদক মোঃ রুবেল হোসেন, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, ফেডারেশনের অন্যান্য কর্মকর্তা, কোচ, ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ ক্রীড়ানুরাগীরা। তাঁদের উপস্থিতিতে বিমানবন্দর প্রাঙ্গণে এক আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ইরাকের সুলায়মানিয়ায় ২৪ থেকে ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের আর্চাররা রিকার্ভ ও কম্পাউন্ড বিভাগে নিজেদের দক্ষতা ও নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রাখেন। বিশেষ করে রিকার্ভ পুরুষ দলীয় ইভেন্টে কাজাখস্তানকে ৬-২ সেট পয়েন্টে পরাজিত করে এশিয়া কাপে প্রথমবারের মতো স্বর্ণপদক অর্জন করে বাংলাদেশ। আব্দুর রহমান আলিফ, মোঃ সাগর ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল মোহাম্মদ রাফির সমন্বয়ে গঠিত দলটি এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে।
এছাড়া কম্পাউন্ড নারী দলীয় ইভেন্টে বন্যা আক্তার, শ্রীপর্ণা বিশ্বাস ও কুলসুম আক্তার মনি কাজাখস্তানকে ২৩০-২২০ স্কোরে পরাজিত করে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। কম্পাউন্ড নারী ব্যক্তিগত ইভেন্টে বন্যা আক্তার কাজাখস্তানের মিলানা বুরলেভাকে ১৪৫-১৪৩ স্কোরে পরাজিত করে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক জয় করেন।
প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের আর্চাররা আরও ৩টি রৌপ্য ও ৪টি ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেন। সব মিলিয়ে ১০টি পদক অর্জনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্চারির অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
দেশে ফেরার পর প্রতিক্রিয়ায় স্বর্ণজয়ী আর্চার বন্যা আক্তার জানান, এশিয়া কাপে এটি তাঁর প্রথম ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক। এই অর্জন আগামীতে বিশ্বকাপ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও অলিম্পিকের মতো বড় আসরে ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগাবে। অন্যদিকে, রিকার্ভ পুরুষ দলের স্বর্ণজয়ী আর্চাররা তাঁদের এই অর্জনকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ভবিষ্যতে দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে আরও বড় সাফল্য অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
দলের টিম ম্যানেজার তাজুল হোসেন বাপ্পী খেলোয়াড়দের জন্য অনুকূল প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, আর্চারির মতো মানসিক চাপ ও মনোযোগনির্ভর খেলায় আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো গেলে আরও ভালো ফল অর্জন সম্ভব।
দলের প্রধান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিক জানান, এবারের দলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ আর্চার ছিলেন। বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-২১ ও অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশে বড় দর্শকের সামনে ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
এদিকে, দেশের ক্রীড়াবিদদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোঃ মাহফুজুল আলম খান।
তিনি জানান, দেশের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ ক্রীড়া ভাতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর আওতায় প্রায় ৩০০ জন ক্রীড়াবিদকে মাসিক এক লাখ টাকা করে ক্রীড়া ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আর্থিক দুশ্চিন্তা কমিয়ে খেলাধুলা ও প্রশিক্ষণে আরও বেশি মনোযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করতে সরকার প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্বাচিত মেধাবী খেলোয়াড়দের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। এর ফলে তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বার্ষিক সূচি অনুযায়ী বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে সীমিত সময়ের প্রস্তুতির পরিবর্তে সারা বছর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
ভারপ্রাপ্ত সচিব আরও উল্লেখ করেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদক অর্জনের সক্ষমতা তৈরি করা। এ লক্ষ্যে খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, দক্ষ কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ, প্রতিভা অন্বেষণ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন মনে করে, সুলায়মানিয়ায় অর্জিত এই সাফল্য দেশের আর্চারির অগ্রযাত্রায় নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে। বিশেষ করে রিকার্ভ পুরুষ দলের ঐতিহাসিক স্বর্ণজয় এবং তরুণ আর্চারদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও বড় অর্জনের পথ সুগম করবে।
এশিয়া কাপের এই সাফল্যকে পুঁজি করে বাংলাদেশের পরবর্তী লক্ষ্য বিশ্বকাপ, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ এবং অলিম্পিকের মতো বিশ্বমঞ্চে দেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরা।










Discussion about this post