নিজস্ব প্রতিবেদক
মদ চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধ করেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’-এর। এ বিষয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিককে হুমকি দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার।
দেশের সব গণমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশ হলেও ‘কিছুই হবে না’ বলে যে চরম ঔদ্ধত্য তিনি প্রকাশ করেছেন, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে সুজন এন্টারপ্রাইজ যে আস্ফালন দেখাচ্ছে, তার নেপথ্যের আসল খুঁটির জোর কোথায়?
গতকাল ৩ মে (রবিবার) চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্টের আওতায় সিসিটি-চার্লি জোনে এক অভিযানে প্রিন্টারের ভেতরে লুকানো ১৮৬ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। ‘প্রিন্টার’ ঘোষণায় আনা পণ্যচালানটি (কন্টেনার নং-SELU4389099) ১০০% কায়িক পরীক্ষা করার সময় প্রতিটি প্রিন্টারের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো অবস্থায় ৫০০ মিলিলিটারের চায়না ব্র্যান্ডের এই মদের বোতলগুলো পাওয়া যায়।
তথ্যানুযায়ী, এই অবৈধ মদের চালানের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার কালিটেকের ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’। পণ্যটি খালাসের দায়িত্বে থাকা সিএন্ডএফ এজেন্টের নাম চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার ‘আবেদ কর্পোরেশন’।
প্রিন্টারের ভিতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো ১৮৬ বোতল অবৈধ মদের চালান আটকের ঘটনার বিষয়ে আজ ৪ মে (সোমবার) অভিযুক্ত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারীর বক্তব্যে জানার জন্য মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিককে হুমকি, দেন ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’এর স্বত্বাধিকারী।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’এর স্বত্বাধিকারী কোনো সদুত্তর না দিয়ে উল্টো চরম ক্ষোভ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেন। তিনি কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং বলেন, ‘১৮৬ বোতল কেন ৫০০০ বোতল ধরা পড়ুক-এটা কোনো বিষয় না।’ আমদানিকারক হুমকি দিয়ে বলেন, ‘পারলে চ্যানেল আই, প্রথম আলোসহ দেশের সব পত্রিকায় নিউজ করেন, কিছু আসে যায় না।’
তিনি দাবি করেন যে,‘তার সাথে কথা বলতে হলে অনুমতি লাগবে এবং তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নন।’ অবৈধভাবে প্রিন্টারের ভিতরে করে মদ চোরাচালানে অভিযুক্ত আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হুমকি দিয়ে আরো বলেন, ‘আমাকে ফোন করেছেন কেন? কমিশনারকে ফোন দেন, ইন্সপেক্টরকে কল দেন। আমার কিছু করতে পারবেন না।’
এদিকে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আবেদ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. শামসুল আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, ‘তিনি তার ছেলে শাকিলের সঙ্গে কথা বলতে বলেন’। শাকিলের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘সুজন এন্টার প্রাইজের মালিক আমাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ফাসিয়ে দিয়েছে। আমরা বৈধভাবে ব্যবসা করি। কিন্তু সুজন এন্টারপ্রাইজ আমাদের চোরাচালানের খাতায় নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। উল্টো আমরা এখন সুজন এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে মামলা করবো’।
অপরদিকে, অবৈধভাবে মদ চোরাচালান, জব্দ ও মামলার বিষয়ে জানতে চেয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিনের মুঠোফোনে খুঁদে বার্তা দিলে তাঁর পক্ষে কথা বলেন সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন। তিনি জানান, ‘অবৈধভাবে বিদেশি মদ আমদানির অভিযোগে অভিযুক্ত সিএন্ডএফ এজেন্ট আবেদ কর্পোরেশনের লাইসেন্স স্থগিত ও মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেই সাথে আমদানিকার সুজন এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে’।
নথিপত্র অনুয়ায়ী সুজন এন্টারপ্রাইজ House#10, Road#01, Kalitek, Nishatnagar, Turag PS, Dhaka-1230, Bangladesh ঠিকানা দিয়ে Customs, Excise and VAT Commissionerate, Dhaka (North) টঙ্গী থেকে আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স প্রাপ্ত হয় ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ ৭টি সিএন্ডএফ এজেন্টকে সর্বমোট ২৬ বার পরিবর্তন করে।
চীন থেকে আসা পণ্য আবেদ কর্পোরেশনের মাধ্যমে সুজন এন্টারপ্রাইজ প্রথম পন্য খালাস করে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। সবমিলিয়ে ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ এর হয়ে ১৯ বার পন্য খালাস করে আবেদ কর্পোরেশন। যেখানে সর্বশেষ ২৩ এপ্রিল ২০২৬-ইং বি/ই করা প্রিন্টারের ভেতরে বিশেষভাবে লুকানো মদের চালানটি আটক করে জব্দ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস কতৃপক্ষ।
সূত্রে জানা যায়, ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ এর মূল কাজই হলো ঘোষিত পণ্যের আড়ালে বিদেশ থেকে অবৈধ পণ্য বিশেষ করে মদ আমদানি করা। যা পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন বারে সরবরাহ করেন ‘সুজন এন্টারপ্রাইজ’ এর স্বত্বাধিকারী। যার অকাট্য প্রমাণ হলো প্রিন্টারের আড়ালে চীন থেকে মদ আমদানি। তবে প্রতিবারই থেকে গেছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এর ক্ষমতার উৎস কোথায়? এবারও কি বেঁচে যাবেন সুজন এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী কিংবা সিএন্ডএফ এজেন্ট আবেদ কর্পোরেশন?
তবে এই ধরণের জালিয়াতি ও অবৈধ আমদানির ঘটনায় মূলত ‘কাস্টমস আইন, ২০২৩’ এবং ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’-এর অধীনে মামলা দায়ের করা হয়। কাস্টমস আইনের ধারা ২০৪, ২০৫ এবং ২০৯ অনুযায়ী পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির অপরাধ এবং ধারা ২৫৬ অনুযায়ী চোরাচালানের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ উদ্ধারের ঘটনায় ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’-এর ধারা ৩৬(১) এর টেবিল ২৪(খ) অনুযায়ী মামলা করার বিধান রয়েছে । মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী আটককৃত মদ ‘এ’ গ্রেডের বলে জানা গেছে।
এই ধারায় অবৈধভাবে মাদক আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিশেষ কায়দায় প্রিন্টারের ভেতরে মাদক লুকিয়ে আনা একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ হওয়ায় এটি ‘অর্গানাইজড ক্রাইম’ হিসেবে গণ্য হবে, যার ফলে জড়িতদের রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










Discussion about this post