মাসুদ রানা, নাগোয়া (জাপান) থেকে:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। আগামীকাল শনিবার বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জাপানের আইচি-নাগোয়ায় পর্দা উঠছে ২০তম এশিয়ান গেমসের।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে শুরু হবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মশাল প্রজ্বালন, পতাকা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ক্রীড়াবিদদের মার্চপাস্টের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর।
এবারের এশিয়াডের মূল বার্তা—‘ইমাজিন ওয়ান এশিয়া’। খেলাধুলার মাধ্যমে এশিয়ার মানুষের বন্ধন আরও দৃঢ় করার লক্ষ্য আয়োজকদের। আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬ দিনব্যাপী এই আসরে এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদদের লড়াইয়ে মুখর থাকবে জাপানের বিভিন্ন ভেন্যু। তবে ফুটবল, বাস্কেটবল ও ক্রিকেটসহ কয়েকটি ডিসিপ্লিনের প্রতিযোগিতা মূল উদ্বোধনের আগেই শুরু হয়েছে।
এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে এশিয়ার ৪৫টি দেশ। আয়োজকদের হিসাবে প্রায় ১৫ হাজার ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তা অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজারে। বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর কারণে আবাসন ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।
সব মিলিয়ে ৪৩টি খেলায় ৪৬৯টি পদকের ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৩ সালের হ্যাংজু এশিয়ান গেমসে ছিল ৪০টি খেলা। এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে মিক্সড মার্শাল আর্টস, প্যাডেল, সার্ফিং, ভার্চুয়াল তায়কোয়ান্দো ও টেকবল। ফুটবল ও টেবিল টেনিসের সমন্বয়ে তৈরি টেকবলও এবারের আসরের নতুন আকর্ষণ।
ভেন্যুর বিস্তৃতিও এবারের এশিয়াডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মূল আয়োজন আইচি প্রিফেকচার ও নাগোয়া শহরকে ঘিরে হলেও কয়েকটি ডিসিপ্লিনের খেলা হচ্ছে জাপানের অন্যান্য শহরেও। সাঁতারের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে টোকিওতে। ফুটবলের ম্যাচ হচ্ছে ওসাকাসহ একাধিক ভেন্যুতে।
আবাসন ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে ভিন্নতা। প্রচলিত অর্থে বড় কোনো ‘অ্যাথলেটস ভিলেজ’ থাকছে না। খরচ কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে হোটেলের পাশাপাশি ‘কোস্টা সেরেনা’ নামের ইতালীয় ক্রুজ জাহাজে এবং রূপান্তরিত কনটেইনারে। শুধু ক্রুজ জাহাজেই প্রায় ৫ হাজার ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
জাপানের জন্যও এবারের আসর বিশেষ তাৎপর্যের। এর আগে ১৯৫৮ সালে টোকিও এবং ১৯৯৪ সালে হিরোশিমায় এশিয়ান গেমস আয়োজন করেছিল দেশটি। দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবারও জাপানের মাটিতে বসছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর।
এশিয়ান গেমসের এবারের আসর অনেক ক্রীড়াবিদের জন্য ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের প্রস্তুতিরও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। আরচ্যারি, হকি, সেলিং, স্কোয়াশ, সার্ফিং, টেনিস ও ট্রায়াথলনে এশিয়ান গেমসের ফলাফল থেকে অলিম্পিকের সরাসরি কোটা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের পাশাপাশি অলিম্পিকের টিকিটের দিকেও থাকবে অনেকের নজর।
এশিয়ান গেমসে বরাবরের মতো এবারও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলগুলো। ২০২৩ সালের হ্যাংজু আসরে চীন ২০১টি সোনা জিতে পদক তালিকার শীর্ষে ছিল। জাপান পেয়েছিল ৫২টি এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৪২টি সোনা। এবারও বড় দলগুলোর পাশাপাশি ছোট দেশগুলোর ক্রীড়াবিদদের লক্ষ্য থাকবে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া।
বাংলাদেশও এবার বড় বহর নিয়ে অংশ নিচ্ছে। ২২টি ডিসিপ্লিনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে লাল-সবুজের ক্রীড়াবিদরা। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) ২৬০ সদস্যের প্রতিনিধি দলে রয়েছেন ১৮৭ জন ক্রীড়াবিদ। তাদের মধ্যে ৯০ জন পুরুষ ও ৯৭ জন নারী। দলের সঙ্গে রয়েছেন ৭৩ জন কর্মকর্তা।
বাংলাদেশের পদকের সম্ভাবনা নিয়ে এবারও সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে আরচ্যারি, শুটিং, অ্যাথলেটিক্স ও ক্রিকেটকে ঘিরে।
অ্যাথলেটিক্সে ইমরানুর রহমানের ১০০ মিটার, লং জাম্পে স্বপ্না খাতুন, ক্রিকেটে পুরুষ ও নারী দল এবং আরচ্যারদের ঘিরে থাকবে বাংলাদেশের দর্শকদের বিশেষ প্রত্যাশা। পাশাপাশি হকি, শুটিং, তায়কোয়ান্দো, টেবিল টেনিস, সাঁতারসহ অন্য ডিসিপ্লিনের ক্রীড়াবিদদের কাছ থেকেও ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশা থাকবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই মাঠে নেমেছে বাংলাদেশের কয়েকটি দল। ফুটবল ও ক্রিকেটসহ কয়েকটি ডিসিপ্লিনে সূচির কারণে আগেভাগেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে পুরুষ হকিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের আগে ভুল করে উত্তর কোরিয়ার জাতীয় সংগীত বাজানোর ঘটনা আলোচনায় এসেছে। পরে আয়োজকরা ভুল সংশোধন করে বাংলাদেশের সঠিক জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
সব প্রস্তুতি শেষে আজ শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অপেক্ষা। সন্ধ্যায় মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে মশাল, পতাকা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াবিদদের মার্চপাস্টে শুরু হবে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এরপর ১৬ দিন ধরে জাপানের বিভিন্ন ভেন্যুতে চলবে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। প্রতিটি ইভেন্ট, প্রতিটি পদক আর প্রতিটি পারফরম্যান্সে লেখা হবে নতুন নতুন ক্রীড়া গল্প।









Discussion about this post